ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে! গবেষকদের ভয়াবহ সতর্কবার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১২:১০ পিএম

২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে! গবেষকদের ভয়াবহ সতর্কবার্তা

ছবিঃ সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এআই যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং আত্ম-উন্নয়নশীল অতি-বুদ্ধিমত্তা বা ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরি হয়, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যেই মানবজাতির অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এআই খাতের কয়েকজন গবেষক।

সম্প্রতি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সাবেক ও বর্তমান গবেষকদের একাংশ এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার আগেই এআই সক্ষমতার প্রতিযোগিতা তীব্র হলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

তবে ২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে—এটি কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। বরং সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও আশঙ্কার একটি চরম চিত্র হিসেবে বিষয়টি সামনে এসেছে।

পদত্যাগের পর জ্যাকব কক্সনের বিস্ফোরক দাবি

এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এআই মডেলের প্রি-ট্রেনিং বিশেষজ্ঞ জ্যাকব কক্সনের পদত্যাগকে ঘিরে। ২৭ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ গণিতবিদ এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার প্রতিবাদে চাকরি ছাড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে কক্সন দাবি করেন, এআই নিয়ে কাজ করা অনেকেই মনে করেন যে এই দশকের শেষ নাগাদ এ প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তার অভিযোগের মূল বিষয় হলো—এআই কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করার আগেই আরও শক্তিশালী ও নিজেকে উন্নত করতে সক্ষম ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

অ্যানথ্রপিক গবেষকেরও বড় আশঙ্কা

কক্সনের বক্তব্যের সঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যানথ্রপিকের এআই অ্যালাইনমেন্ট বিভাগের প্রধান ইভান হুবিঙ্গার। তাঁর মতে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানুষের বিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির স্কেলেবল ওভারসাইট বিভাগের প্রধান স্যামুয়েল মার্কসও। তাঁদের আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে এসব সিস্টেমকে মানুষের মূল্যবোধ, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা সম্ভব হবে কি না।

এআই নিরাপত্তা গবেষণায় এই বিষয়টিকেই সাধারণভাবে ‘অ্যালাইনমেন্ট’ সমস্যা বলা হয়। অর্থাৎ অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মানুষের লক্ষ্য ও নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

কীভাবে মানবজাতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে?

গবেষকদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো অত্যন্ত শক্তিশালী এআই সিস্টেমের অপব্যবহার। কোনো উন্নত এআই যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় অথবা ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সাইবার নিরাপত্তা থেকে শুরু করে জৈবপ্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অত্যন্ত সক্ষম এআই ব্যবহার করে বড় ধরনের সাইবার হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে। একইভাবে ক্ষতিকর প্রযুক্তি বা জৈব অস্ত্র তৈরির জ্ঞান ও প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানোর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের সক্ষমতা উন্নত করার ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো সিস্টেম পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেটিকে থামানো কতটা সম্ভব হবে—এ প্রশ্নও এআই নিরাপত্তা গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে কেন এত ভয়?

বর্তমানে ব্যবহৃত অধিকাংশ এআই সিস্টেম নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন, তথ্য বিশ্লেষণ, লেখা তৈরি, কোডিং কিংবা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানে মানুষের সহায়তা করে। কিন্তু গবেষকদের আশঙ্কার বড় অংশ ভবিষ্যতের এমন এআই নিয়ে, যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ ধরনের সম্ভাব্য ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’। এটি বাস্তবে কবে তৈরি হবে বা আদৌ তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে যদি এমন প্রযুক্তি তৈরি হয়, তাহলে সেটির সক্ষমতা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে—এটি এখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা

ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিকসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী এআই মডেল তৈরিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার চাপ যদি নিরাপত্তা গবেষণার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করার সুযোগ কমে যেতে পারে।

এ কারণেই এআই নিরাপত্তা গবেষকেরা প্রযুক্তির উন্নয়ন বন্ধ করার পরিবর্তে উন্নয়নের সঙ্গে সমান্তরালে শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন।

রাজনীতিতেও উঠছে এআই নিয়ন্ত্রণের দাবি

এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে প্রযুক্তি অঙ্গনের বাইরে রাজনীতিতেও আলোচনা তীব্র হয়েছে। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ কয়েকজন রাজনীতিবিদ এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতিকে বিপজ্জনক হিসেবে বর্ণনা করে এর উন্নয়ন ও ব্যবহারে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতিমালা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছে। বিশেষ করে সামরিক ব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে।

নিরাপত্তা জোরদারের কথা অ্যানথ্রপিকের

গবেষকদের উদ্বেগের পর অ্যানথ্রপিক তাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতো শীর্ষস্থানীয় এআই নির্মাতারা উন্নত মডেল তৈরির পাশাপাশি নিরাপত্তা পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ক্ষতিকর ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে গবেষকদের একটি অংশের মতে, প্রযুক্তির সক্ষমতা যে গতিতে বাড়ছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নীতিমালা সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে কি না—সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আতঙ্ক নয়, সতর্কতার বার্তা

এআই নিয়ে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। তবে এ ধরনের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ মনে করেন, উন্নত এআই মানবসভ্যতার জন্য অভূতপূর্ব সুফল বয়ে আনতে পারে; আবার কেউ মনে করেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে একই প্রযুক্তি বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

তাই ‘২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে’—এই দাবির চেয়ে বড় বিষয় হলো, মানুষের নিয়ন্ত্রণে রেখে কীভাবে নিরাপদভাবে এআইয়ের উন্নয়ন করা যায়। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব বা কাম্য কি না, সেই বিতর্কের পাশাপাশি এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরিই এখন বিশ্ববাসীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!