বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত। শুক্রবার (২১ আগস্ট) নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতের বিচারক জেনেট এ. ভার্গাস এই রায় দেন।
আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার যে নীতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর চালু করেছিল, সেটির ওপর বড় ধরনের আইনি আঘাত এলো। তবে রায়ের পরপরই সব আবেদনকারীর ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইস্যু হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো তৈরি হয়নি।
জানুয়ারি থেকে কার্যকর ছিল ভিসা স্থগিতের নীতি
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি এক ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ২১ জানুয়ারি থেকে নীতিটি কার্যকর হয়।
এর আওতায় থাকা দেশগুলোর নাগরিকেরা ভিসার আবেদন করতে এবং নির্ধারিত সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে পারলেও চূড়ান্তভাবে অভিবাসী ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মার্কিন সরকারের যুক্তি ছিল, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। এ যুক্তির ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যুতে সামগ্রিক স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশও ওই ৭৫ দেশের তালিকায় থাকায় দেশটির বহু নাগরিকের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে যাওয়ার প্রক্রিয়া আটকে যায়।
আদালতে চ্যালেঞ্জ, প্রশ্ন ওঠে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন নিয়ে
ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিবাসী অধিকার সংগঠন, অভিবাসী এবং মার্কিন নাগরিকদের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়।
মামলায় পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৪ জানুয়ারির ঘোষণা এবং পরবর্তী নির্দেশনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। বাদীপক্ষের প্রধান যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জাতীয়তা আইন অনুযায়ী ভিসা আবেদনকারীদের পৃথকভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিন্তু ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য একযোগে ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখার নীতিতে সেই ব্যক্তিগত মূল্যায়নের সুযোগ কার্যত সীমিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন বাদীপক্ষ।
তাদের যুক্তি, কোনো ব্যক্তি কোন দেশের নাগরিক—শুধু এই একটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার অভিবাসী ভিসা আটকে রাখা আইনসঙ্গত নয়। প্রত্যেক আবেদনকারীর পরিস্থিতি, যোগ্যতা ও আইনগত অবস্থান আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
‘পুরো নীতিই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’
শুক্রবারের রায়ে বিচারক জেনেট এ. ভার্গাস পররাষ্ট্র দপ্তরের সামগ্রিক ভিসা স্থগিত নীতিকে আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করেন।
আদালত প্রশাসনিক কার্যপ্রণালি আইনের (Administrative Procedure Act) অধীনে পুরো নীতিটি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে এটি কোনো নির্দিষ্ট আবেদনকারী বা একটি পরিবারের ভিসা আবেদন পুনর্বিবেচনার নির্দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ৭৫ দেশের নাগরিকদের ওপর প্রয়োগ করা সামগ্রিক নীতির বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এ কারণে নিউইয়র্কের রায়টি আগের একটি মামলার তুলনায় বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগেও নীতিটি বেআইনি ঘোষণা হয়েছিল
এর আগে একই ভিসা নীতির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা হয়।
গত ৩১ জুলাই বিচারক অ্যামিট পি. মেহতা ব্রাজিলের নাগরিক নিউটন দে মোরাউ গোমেস ও তার পরিবারের করা মামলায় পররাষ্ট্র দপ্তরের নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করেন।
তবে ওই রায়ে মূলত সংশ্লিষ্ট পরিবারটির আবেদন পুনরায় ব্যক্তিগতভাবে মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ৭৫ দেশের নাগরিকদের ওপর প্রয়োগ করা পুরো নীতি বাতিল করা হয়নি।
নিউইয়র্কের সর্বশেষ রায়ের বিশেষত্ব এখানেই—এবার আদালত সামগ্রিক নীতিটির বৈধতা নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং নীতিটি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
জানুয়ারি থেকে অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বহু বাংলাদেশি পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানদের পারিবারিক পুনর্মিলন এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসী ভিসার আবেদনকারীদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হয়। অনেকের আবেদন প্রক্রিয়া এগোলেও ভিসা ইস্যু না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চূড়ান্ত ধাপ আটকে ছিল।
নিউইয়র্কের আদালতের রায় তাই এসব আবেদনকারীর জন্য নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রায়ের পরপরই সব বাংলাদেশি আবেদনকারীর ভিসা হাতে চলে আসবে। নীতি বাতিলের পরও প্রত্যেক আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আবেদনকারীর অন্য কোনো আইনগত অযোগ্যতা থাকলে সেটিও পৃথকভাবে বিবেচনা করতে পারবেন কনস্যুলার কর্মকর্তারা।
এখন নজর মার্কিন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপে
আদালতের রায়ের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মার্কিন সরকার কী পদক্ষেপ নেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে উচ্চতর আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। সে ক্ষেত্রে মামলাটি আরও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে এবং নীতিটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকার যদি রায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর স্থগিতাদেশ না পায়, তাহলে পররাষ্ট্র দপ্তরকে ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হতে পারে।
বিশেষ করে আগে আবেদন করা, সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করা কিংবা ভিসা ইস্যুর অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের আবেদন কীভাবে পুনরায় বিবেচনা করা হবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য নতুন আশার আলো
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা স্থগিত রাখার নীতিকে আদালতের বাতিলের সিদ্ধান্ত তাই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি। তবে রায়ের বাস্তব প্রভাব পুরোপুরি স্পষ্ট হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে।
মার্কিন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, আপিলের সম্ভাবনা এবং পররাষ্ট্র দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মার্কিন দূতাবাসগুলোর নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশিদের ভিসা কার্যক্রম কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
অর্থাৎ, ভিসা স্থগিতের সামগ্রিক নীতি বাতিল হলেও প্রত্যেক আবেদনকারীর ভিসা নিশ্চিত হয়েছে—এমন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসী ভিসা আবেদনকারীদের জন্য নিউইয়র্কের এই রায় নিঃসন্দেহে নতুন আশার দ্বার খুলেছে।

