হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাস্টমসের সাবেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল আলমকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি একজন অভিযোগকারী গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে এসব দাবি করেছেন। অভিযোগে শফিউল আলমের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও শালার নামে সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করারও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকিছুর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে শফিউল আলমকে ঘিরে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় সেগুলো কার্যকর তদন্ত বা শাস্তির পর্যায়ে যায়নি।
বিমানবন্দরে ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর থেকেই শফিউল আলমের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তী সময়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পাওয়ার পর সেখানে স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তোলার অভিযোগ করা হয়েছে। চোরাচালানের মাধ্যমে আসা স্বর্ণের চালান নির্বিঘ্নে পার করে দিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সঙ্গে কয়েকজন কর্মচারী ও কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এ কারণে বিভিন্ন অভিযোগ উঠলেও সেগুলো প্রভাব খাটিয়ে সামাল দেওয়া হতো।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা আদালতে প্রমাণিত কোনো তথ্য অভিযোগের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়নি।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
শফিউল আলমের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। এছাড়া চলাচলের জন্য ব্যবহৃত একটি দামি গাড়ি তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তারের নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, নিজের নামে সম্পদ রাখার পরিবর্তে স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুরবাড়ির বিভিন্ন সদস্যসহ আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ কেনা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত সম্পদের তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং অভিযোগে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পদের সম্পর্ক যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিআরটিএ, ব্যাংক ও কর নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
টিআইএন ও আয়কর রিটার্ন নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, শফিউল আলম এবং তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তারের নামে টিআইএন নেই এবং তাঁরা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন না।
যদিও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও করসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালার আওতাভুক্ত, তাই অভিযোগটি সত্য কি না তা সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তাঁর কর-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না এবং কোনো জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

দুদকের অনুসন্ধানের দাবি
অভিযোগে বলা হয়েছে, শফিউল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা অনুসন্ধানের বর্তমান অগ্রগতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে অভিযোগে উল্লিখিত দুদকের কার্যক্রমের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গ্রামেও সম্পদ নিয়ে নানা আলোচনা
অভিযোগে শফিউল আলমের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা ইউনিয়নের আমজানি গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি গ্রামে নিয়মিত থাকেন না; মাঝে মাঝে গাড়ি নিয়ে সেখানে যান।
অভিযোগকারীর দাবি, তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্পদের একটি অংশ ঢাকার পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ি বগুড়া সদর এলাকাতেও রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের এমন বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ জানতে সরকারি নথি, দলিল, ব্যাংক হিসাব ও আয়কর বিবরণী যাচাই করাই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
অভিযোগ অস্বীকার শফিউল আলমের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন এবং বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবেশদ্বার। এখানে স্বর্ণসহ মূল্যবান পণ্য চোরাচালান ঠেকাতে কাস্টমস, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি রয়েছে।
তাই কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে চোরাচালানকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তা কেবল অভিযোগ হিসেবে রেখে না দিয়ে নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে শফিউল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে তাঁর আয়, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, গাড়ির মালিকানা এবং বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালের সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ফলে এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাইয়ের দিকে।

