ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

ক্ষমতার ছত্রছায়ায় বিতর্কিত উত্থান? কাস্টমস কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহকে ঘিরে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

ক্ষমতার ছত্রছায়ায় বিতর্কিত উত্থান? কাস্টমস কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহকে ঘিরে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

বর্তমানে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে একটি প্রভাবশালী দুর্নীতির বলয় গড়ে তোলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর গ্রামের বাড়ি নওগাঁয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপককে বিয়ে করেছেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি নিজেকে তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ২০২০-২১ সালে ঢাকা ভ্যাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে প্যানেল ভেঙে পদায়ন নিশ্চিত করেন।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্নু হাজরার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলন দমনে ওই নেতাকে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিলেন ওয়াসেক বিল্লাহ। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি উত্তরার বিতর্কিত ‍‍`কিংফিশার বার‍‍`-এর লাইসেন্স ও অনুমোদন সংগ্রহ করেন। যদিও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি তাঁর এক বন্ধুর নামে পরিচালিত হচ্ছে, অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত মালিকানা এখনও তাঁরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বান্দরবানে অভিযানের নামে হয়রানির অভিযোগ

ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সূচনা চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটের অধীন বান্দরবান সাব-ডিভিশনে কর্মরত থাকার সময় থেকেই বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় তাঁর সহযোগী কর্মকর্তা মানিক দত্তকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান পরিচালনার নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি, অতিথিদের কক্ষে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তছনছ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায়। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে মামলা ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল বান্দরবান হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত স্মারকলিপি দেয়।

টেকনাফে পদায়ন ও নতুন অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, বান্দরবানের পর তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি টেকনাফ কাস্টমস স্টেশনে পদায়ন পান।

এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারকারী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, কাঠের গুঁড়ি ও আচার ভর্তি প্যাকেটের আড়ালে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা কাস্টম হাউসে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

গত প্রায় ১০ মাস ধরে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত ওয়াসেক বিল্লাহ বর্তমানে এয়ারফ্রেইট ইউনিটের ডেলিভারি গেট-১-এর দায়িত্বে রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য খালাস হওয়া এই ইউনিটে তিনি গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করেন। আরও অভিযোগ, মিথ্যা ঘোষণা ব্যবহার করে উচ্চ শুল্কের, শর্তযুক্ত কিংবা নিষিদ্ধ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে ‍‍`ভিআইপি সুবিধায়‍‍` খালাস করে দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব পণ্যের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ থাকা ‍‍`কিংফিশার বার‍‍`-এ সরবরাহ করা হয়। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি ফাইলে স্বাক্ষরের জন্যও তিনি ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন এবং ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না।

দুদকে লিখিত অভিযোগ

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ভিউ ব্রিড বাংলাদেশ লিমিটেড-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহসিন হোসেনের করা একটি লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, গত ছয় মাসে রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আমদানি শর্ত ও ঘোষণাপত্র যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই ভিআইপি সুবিধায় বিভিন্ন পণ্য খালাস করে দেওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে এসব পণ্য বাজারে প্রবেশ করায় বৈধ ব্যবসায়ীরা মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

ওয়াসেক বিল্লাহর অবৈধ সম্পদের অংশ হিসেবে রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া মৌজায় তাঁর নামে ৩৬৪৯৭ নম্বর খতিয়ানে ৩৩ শতক জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে গড়ে ওঠা এই কথিত দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।

বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তায়  প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

সুত্র:সি.পো

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!