জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিসের তৎপরতা, মাঠপর্যায়ের তহশিল অফিসগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং ভূমি মালিকদের কর পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করার ফলে এ সাফল্য এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চলতি অর্থবছরে পাঁচবিবি উপজেলায় সাধারণ ভূমি মালিকদের কাছ থেকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৬ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৯৩ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৪৭ টাকা বেশি আদায় হয়েছে। মোট আদায়ের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, ভূমি মালিকদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা এবং উপজেলা ভূমি অফিস ও মাঠপর্যায়ের তহশিল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ অর্জনের অন্যতম কারণ।
আটাপুর ইউনিয়নে সর্বোচ্চ আদায়
পাঁচবিবি উপজেলায় আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট আটটি তহশিল অফিসের মাধ্যমে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব তহশিল অফিসের মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়সহ ভূমি ব্যবস্থাপনার নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে আটাপুর ইউনিয়ন তহশিল অফিস এগিয়ে রয়েছে। এ অফিসের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ লাখ ২৮ হাজার ১৬৬ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ৯০০ টাকা।
অর্থাৎ আটাপুর ইউনিয়নে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩৪ টাকা বেশি ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর আদায়ে ঘাটতি
সাধারণ ভূমি মালিকদের কাছ থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা সম্ভব হলেও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছ থেকে পাওনা ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি।
পাঁচবিবি উপজেলায় সরকারি সংস্থা থেকে পাওনা ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৪৩০ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ২১৬ টাকা।
অর্থাৎ সরকারি সংস্থার কাছ থেকে নির্ধারিত পাওনার প্রায় ৬ লাখ ১৫ হাজার ২১৪ টাকা এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ ভূমি মালিকদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পাওনা আদায়েও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
তৎপরতা ও মনিটরিংয়ে গুরুত্ব
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকারি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ে তদারকি ও মনিটরিং করা হয়েছে। ভূমি মালিকদের সময়মতো ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তহশিল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিগত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বেলায়েত হোসেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাশপিয়া তাসরিনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে কিছু বিড়ম্বনা
ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের হার সন্তোষজনক হলেও মাঠপর্যায়ে ভূমি মালিকদের একটি অংশকে বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জমি খারিজ বা নামজারি এবং খাজনা পরিশোধের সময় ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন অনেকে।
একাধিক সহকারী ভূমি উন্নয়ন কর্মকর্তা (তহশিলদার) জানান, নতুন ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ক্ষেত্রে কারও কারও তথ্য, কোড বা মোবাইল ফোন নম্বর সঠিকভাবে না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যার কারণেও অনেক সময় কর পরিশোধে বিড়ম্বনা তৈরি হয়।
তাদের দাবি, প্রযুক্তিগত এসব সমস্যার পাশাপাশি কিছু দালালের তৎপরতাও ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে।
রাজস্ব আদায়ে ভূমি অফিসের গুরুত্ব
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাশপিয়া তাসরিন বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব আদায়ে মাঠপর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হলো ভূমি অফিসসমূহ। প্রতিবছর সাধারণ ভূমি মালিক এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক—এই দুই ক্যাটাগরিতে সাধারণ ও সংস্থার দাবি নির্ধারণ করা হয়।’
তিনি বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের জন্য উপজেলা প্রশাসন, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন এবং ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। এর ফলে মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বা সংস্থার কাছ থেকে পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আরও জোরালো ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
‘সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব’
কাশপিয়া তাসরিন আরও বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমি উন্নয়ন কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, ভূমি মালিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘সর্বোপরি সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিবছর সরকারের মূল রাজস্ব আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের।’
লক্ষ্যমাত্রার বেশি আদায়, সামনে আরও চ্যালেঞ্জ
পাঁচবিবিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাধারণ ভূমি মালিকদের কাছ থেকে লক্ষ্যমাত্রার ১০৬ শতাংশ ভূমি উন্নয়ন কর আদায় নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য অর্জন। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে ঘাটতি থাকায় এ খাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ভূমিসেবা ব্যবস্থায় তথ্যগত ভুল, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও ইন্টারনেট-সংক্রান্ত জটিলতা কমানো গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমবে। দালালনির্ভরতা কমিয়ে ভূমি উন্নয়ন কর ও অন্যান্য ভূমিসেবা আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা গেলে সরকারি রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ভূমি মালিকদের আস্থাও আরও বাড়বে।

