বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা প্রায় ৭৩ মেট্রিক টন ডুপ্লেক্স বোর্ডসহ মোট ১০টি ট্রাক পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকা থেকে আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আটক ট্রাকগুলোর মধ্যে ৯টিতে ডুপ্লেক্স বোর্ড এবং অপর একটিতে অশনাক্তকৃত পণ্য রয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান MEHALI PAPERS PVT. LTD. থেকে খুলনার বন্ডেড প্রতিষ্ঠান SRI FLEXOPACK LTD.-এর নামে এসব পণ্য আমদানি করা হয়। পণ্যগুলোর নির্ধারিত গন্তব্য ছিল খুলনার তেলিগাতি, কুয়েট, আড়ংঘাটা এলাকার প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত স্থাপনা। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে ট্রাকগুলো পথ পরিবর্তন করে পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় প্রবেশ করে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৮ আগস্ট দিবাগত রাতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় নয়াবাজারমুখী ট্রাকের বহর কাস্টমস গোয়েন্দাদের উপস্থিতি টের পেয়ে একটি ট্রাক দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে নয়াবাজারে আগে থেকেই অবস্থানরত এবং পণ্য খালাসের প্রস্তুতিতে থাকা আরও একটি ট্রাক শনাক্ত করা হয়। অভিযান শেষে মোট ১০টি ট্রাক কাস্টমস গোয়েন্দাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়। পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

নির্ধারিত রুট ছেড়ে নয়াবাজারে কেন?
চট্টগ্রাম থেকে খুলনাগামী পণ্যবাহী যানবাহনের প্রচলিত বাইপাস রুট হলো—কাঁচপুর, সাইনবোর্ড, পোস্তগোলা, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা। এ রুটের বাইরে পুরান ঢাকার নয়াবাজার, রায়সাহেব বাজার ও তাঁতীবাজার এলাকায় প্রবেশের যৌক্তিকতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাগজ স্থানীয় আড়তে খালাস ও বিক্রির উদ্দেশ্যেই ট্রাকগুলো নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুত হয়ে নয়াবাজারে প্রবেশ করে থাকতে পারে। যে আড়তে পণ্যগুলো বিক্রির চেষ্টা চলছিল বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে, তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের আশঙ্কা
বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল সংশ্লিষ্ট বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কারখানা বা গুদামে নিয়ে উৎপাদন কাজে ব্যবহারের বিধান রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এসব পণ্য অন্যত্র স্থানান্তর, খোলাবাজারে বিক্রি কিংবা অনুমোদিত উৎপাদন কার্যক্রমের বাইরে ব্যবহার করা হলে তা বন্ড সুবিধার শর্ত লঙ্ঘনের পাশাপাশি শুল্ক-কর ফাঁকির সম্ভাব্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে আটক পণ্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। নথিপত্র যাচাই, পণ্যের হিসাব এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণের পর দায় নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
যেসব বিষয় খতিয়ে দেখছে কাস্টমস
আটক ট্রাকগুলোর মালিকানা ও নিবন্ধন, প্রতিটি ট্রাকে থাকা পণ্যের পরিমাণ, প্যাকেজ সংখ্যা, কনটেইনার ও পরিবহন সিলের অখণ্ডতা এবং আমদানিসংক্রান্ত বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্ট যাচাই করা হচ্ছে।
পাশাপাশি SRI FLEXOPACK LTD.-এর বন্ড লাইসেন্স, ইউটিলাইজেশন পারমিশন, পণ্য পরিবহনের সময়সূচি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট M.A. AZAD & CO. LTD. এবং পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান ডেলটা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস-এর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া নয়াবাজারের সম্ভাব্য ক্রেতা বা আড়তদার, পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা, এর আগে একই কৌশলে বন্ডেড পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না এবং এতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণও নিরূপণ করা হচ্ছে।
চক্র শনাক্তে অনুসন্ধান অব্যাহত
আটক পণ্য ও ট্রাকগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত, পণ্যের পরিমাণ নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের কাজ চলছে। তদন্তে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, নির্ধারিত গন্তব্য পরিবর্তন, অবৈধভাবে পণ্য খালাস বা খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত কাস্টমস ও বন্ডসংক্রান্ত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত, সম্ভাব্য ক্রেতা ও আড়তদারদের চিহ্নিত এবং বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য নয়াবাজারে নেওয়ার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

