ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ব্যবসায়ীদের দাবিতে টার্নওভার কর কমাচ্ছে এনবিআর ২ কোটি পর্যন্ত করমুক্ত, ২–৪ কোটিতে ০.৫%

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ১১:৩৬ এএম

ব্যবসায়ীদের দাবিতে টার্নওভার কর কমাচ্ছে এনবিআর  ২ কোটি পর্যন্ত করমুক্ত, ২–৪ কোটিতে ০.৫%

ছবিঃ সংগৃহীত

ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও উদ্বেগের পর ন্যূনতম টার্নওভার করের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন আয়কর আইনে লাভ-লোকসান নির্বিশেষে বার্ষিক বিক্রির ওপর ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম টার্নওভার কর আরোপের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা থেকে সরে আসছে সংস্থাটি।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বার্ষিক মোট বিক্রি বা গ্রস প্রাপ্তি ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে কোনো টার্নওভার কর দিতে হবে না। ২ কোটি টাকার বেশি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বিক্রির ক্ষেত্রে টার্নওভার করের হার নির্ধারণ করা হচ্ছে ০.৫ শতাংশ। আর বার্ষিক বিক্রি ৪ কোটি টাকার বেশি হলে ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হবে।

এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তুতি চলছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ব্যবসায়ীদের চাপেই পরিবর্তন

চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর টার্নওভার করের হার নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যবসার মোট বিক্রির ওপর কর নির্ধারণ করা হলে প্রকৃত মুনাফা না থাকলেও কর পরিশোধ করতে হবে। এতে লোকসানি বা স্বল্পমুনাফার ব্যবসাগুলোও অতিরিক্ত করের চাপে পড়বে।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি ছিল, বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং কর্মীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলেও প্রকৃত মুনাফা খুবই কম। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানেও পরিচালিত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিক্রির ওপর ১ শতাংশ ন্যূনতম কর আরোপ করা হলে ব্যবসার মূলধন থেকেই কর পরিশোধ করতে হবে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন করে করহার পুনর্বিবেচনা করেছে এনবিআর।

নতুন কাঠামোয় কত কর দিতে হবে

এনবিআরের প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী—

বার্ষিক বিক্রি ২ কোটি টাকা পর্যন্ত: টার্নওভার কর নেই
২ কোটি ১ টাকা থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত: ০.৫ শতাংশ
৪ কোটি টাকার বেশি: ১ শতাংশ

ফলে ছোট ব্যবসাগুলোর একটি বড় অংশ ন্যূনতম টার্নওভার করের আওতার বাইরে থাকবে। একই সঙ্গে মাঝারি আকারের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় করের চাপ কমবে।

টার্নওভার কর কী

টার্নওভার কর হলো কোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মোট বিক্রি, লেনদেন বা গ্রস প্রাপ্তির ওপর নির্ধারিত হারে আরোপিত কর। সাধারণ আয়করের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় বা মুনাফা বিবেচনায় নেওয়া হলেও টার্নওভার করের ক্ষেত্রে ব্যবসার মোট প্রাপ্তি কর নির্ধারণের অন্যতম ভিত্তি।

আয়কর আইনজীবী হাসানুর রহমানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারায় টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে সংশোধিত ধারা ১৬৩(৬) অনুযায়ী, নির্ধারিত আয়কর টার্নওভার করের চেয়ে কম হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা বা পেশার মোট গ্রস প্রাপ্তির ওপর নির্ধারিত হারে টার্নওভার কর দিতে হয়।

অর্থাৎ, আইনের আওতাভুক্ত ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে তার মোট বিক্রয় বা গ্রস প্রাপ্তিও কর নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে।

সব খাতে একই হার নয়

তবে সব ধরনের ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য টার্নওভার করের হার এক নয়। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ, কার্বনেটেড ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ শতাংশ টার্নওভার করের বিধান রয়েছে।

এখন নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত বিক্রিকে করমুক্ত এবং ২ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বিক্রিতে ০.৫ শতাংশ কর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক স্বস্তি পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে স্বস্তি মিলবে

ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিক্রির পরিমাণকে একমাত্র সূচক ধরে কর নির্ধারণ করলে ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের বিক্রি থাকলেও পণ্য কেনা, কর্মচারীদের বেতন, দোকান বা কারখানার ভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস, পরিবহন, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত মুনাফা অনেক কম হতে পারে।

এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে হিসাবের শেষে লোকসানও থাকতে পারে। কিন্তু টার্নওভার করের আওতায় পড়লে বিক্রি হয়েছে—এই কারণেই কর দিতে হবে। ফলে ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা কার্যকর মূলধন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এ কারণে নতুন করহার নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর করের চাপ কমিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

এখন এনবিআরের প্রজ্ঞাপন জারির পর নতুন কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। প্রজ্ঞাপনে করহার, আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত শর্ত স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!