আল-কায়েদার প্রয়াত নেতা ওসামা বিন লাদেন একসময় যেসব দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর কথা বিবেচনা করেছিলেন, সেই তালিকায় ভারতও ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) প্রকাশিত কয়েকটি প্রেসিডেনশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্রিফে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে ভারতের কোনো নির্দিষ্ট স্থাপনা, ব্যক্তি বা লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা এসব নথিতে উল্লেখ নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে সিআইএর প্রকাশিত নথির বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
৭০টির বেশি গোয়েন্দা ব্রিফ প্রকাশ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত শুক্রবার ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার কর্মকাণ্ড নিয়ে ৭০টির বেশি প্রেসিডেনশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্রিফ প্রকাশ করেছে সিআইএ। এসব নথিতে ১০০টিরও বেশি পৃষ্ঠা রয়েছে।
সিআইএর প্রকাশ করা নথিগুলোতে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কাছে দেওয়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সতর্কতার চিত্র উঠে এসেছে। নথিগুলোর সময়কাল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন থেকে জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট থাকার সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।
ভারতের পাশাপাশি যেসব দেশের কথা ছিল
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালের ২৮ আগস্টের একটি প্রেসিডেনশিয়াল ব্রিফে বিন লাদেনের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন ছিল। ‘বিন লাদিন টেররিস্ট নেটওয়ার্ক স্টিল আ থ্রেট’ শিরোনামের ওই নথিতে ভারত ছাড়াও পাকিস্তান, মিসর, কুয়েত, সৌদি আরব, ইয়েমেন, উগান্ডা এবং ‘সম্ভবত’ নাইজেরিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নথিটির বেশ কিছু অংশ এখনো গোপন রাখা হয়েছে। প্রকাশিত কপির কিছু অংশ কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের উৎসও গোপন রাখা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, হামলার সময়সূচি কিংবা সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার কথা নথিতে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ভারতকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল—এমন তথ্য পাওয়া গেলেও সেখানে হামলার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ছিল, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
বহু দেশে আল-কায়েদার নেটওয়ার্ক
সিআইএর মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, আফগানিস্তানে অবস্থানরত বিন লাদেন ও অন্যান্য সন্ত্রাসী নেতারা দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। তাদের যোগাযোগব্যবস্থাও অক্ষত ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়।
গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন ছিল, আল-কায়েদা তাদের কিছু প্রশিক্ষণ শিবিরে আবার কার্যক্রম শুরু করেছিল। পাশাপাশি কিছু শিবির অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছিল।
নথিতে আরও বলা হয়, আল-কায়েদার প্রধান অন্তত ৬০টি দেশে থাকা ব্যক্তি ও সহযোগী গোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে সম্ভাব্য হামলার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আল-কায়েদার কার্যক্রম শুধু আফগানিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সংগঠনটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগী ও যোগাযোগের একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে তুলেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও হামলার আশঙ্কা
১৯৯৮ সালের ওই গোয়েন্দা ব্রিফে বলা হয়েছিল, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার শিবিরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে আরও হামলা চালানোর চেষ্টা করছিলেন।
সিআইএর নথিতে আরও বলা হয়, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় বিন লাদেনের ‘সুপ্রতিষ্ঠিত অবকাঠামো’ ছিল। ফলে এসব অঞ্চলেও মার্কিন স্বার্থকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা নিয়ে পাওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোকে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করা হয়েছিল।
এতে স্পষ্ট হয়, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিন লাদেন ও আল-কায়েদার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিল।
৯/১১ হামলার আগে একাধিক সতর্কতা
সিআইএর প্রকাশ করা নথিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্টদের একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল।
তবে এসব গোয়েন্দা ব্রিফের অনেক তথ্য ছিল সম্ভাব্য হুমকি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও আশঙ্কাভিত্তিক। সব তথ্য যে নির্দিষ্ট হামলার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা নয়। নতুন করে প্রকাশিত নথিগুলো সেই সময়কার গোয়েন্দা মূল্যায়নের ধরন এবং আল-কায়েদার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগের মাত্রা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সিআইএর ভাষ্যে ‘নজিরবিহীন স্বচ্ছতা’
নথি প্রকাশের বিষয়ে সিআইএ এক বিবৃতিতে বলেছে, এসব প্রেসিডেনশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্রিফ প্রকাশের মাধ্যমে ‘আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোর একটির আগের বছরগুলো এবং তার পরের দিনের আমেরিকার সবচেয়ে সংবেদনশীল গোয়েন্দা প্রকাশনার বিষয়ে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা’ তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটির এই উদ্যোগের ফলে ৯/১১ হামলার আগে আল-কায়েদা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সংগঠনটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি নিয়ে তৎকালীন প্রশাসনের কাছে কী ধরনের তথ্য পৌঁছেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নথিভিত্তিক চিত্র সামনে এসেছে।
কীভাবে ঘটেছিল ৯/১১ হামলা
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করেন। এর মধ্যে দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। ভয়াবহ ওই হামলায় ভবন দুটি ধসে পড়ে।
তৃতীয় বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত করে। চতুর্থ বিমানটি হোয়াইট হাউস অথবা মার্কিন কংগ্রেস ভবনকে লক্ষ্য করে যাচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে বিমানের যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে সেটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
৯/১১ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত। এই হামলার পর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, নিরাপত্তানীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
সিআইএর নতুন করে প্রকাশ করা নথিগুলো সেই হামলার আগে ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যক্রম, আল-কায়েদার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে তৎকালীন মূল্যায়ন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন তথ্যের সুযোগ তৈরি করেছে।

