ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চালুর উদ্যোগ, বৈঠক আগামীকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চালুর উদ্যোগ, বৈঠক আগামীকাল

ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিসগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠেয় বার্ষিক ইন্টার-গভর্নমেন্টাল রেলওয়ে মিটিং (আইজিআরএম)-এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। দুই দিনব্যাপী এবারের বৈঠক মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় শুরু হচ্ছে।

বৈঠকে ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেস, খুলনা-কলকাতা রুটের বন্ধন এক্সপ্রেস এবং ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটের মিতালী এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মত হলে আগামী মাস থেকেই ট্রেনগুলোর চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র।

একই সঙ্গে রাজশাহী থেকে কলকাতা রুটে নতুন একটি আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাবও বৈঠকে উপস্থাপন করবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

ঢাকায় শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী আইজিআরএম বৈঠক

বাংলাদেশ ও ভারতের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আন্তঃদেশীয় রেল পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় আইজিআরএম বৈঠকে। প্রতিবছর বাংলাদেশ ও ভারতে পালাক্রমে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

এবারের বৈঠক ঢাকার রেলভবনে অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠককে সামনে রেখে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার বিষয়গুলো ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

বৈঠকে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা, নতুন রেলপথে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর সম্ভাবনা, দুই দেশের রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর করা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

তিনটি বন্ধ ট্রেন চালুর বিষয়ে আলোচনা

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বর্তমানে বন্ধ থাকা তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন হলো—মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস ও মিতালী এক্সপ্রেস।

মৈত্রী এক্সপ্রেস ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে যাত্রী পরিবহন করে। বন্ধন এক্সপ্রেস খুলনা থেকে কলকাতা রুটে এবং মিতালী এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি রুটে চলাচল করত।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এসব ট্রেন পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় দুই দেশের নিয়মিত যাত্রী, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের মধ্যে আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েরও আগ্রহ রয়েছে। তবে কেবল রেল কর্তৃপক্ষের সম্মতিতে ট্রেনগুলো চালু করা সম্ভব হবে না।

শুধু রেল কর্তৃপক্ষের সম্মতিই যথেষ্ট নয়

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচলের সঙ্গে নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক বিষয় জড়িত থাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের মতামত প্রয়োজন হবে।

মঙ্গলবারের বৈঠকে এসব মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। ফলে রেল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনায় আসবে।

কর্মকর্তাদের মতে, আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পর্যায় থেকেই আসবে।

আগামী মাসে ট্রেন চলাচলের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র বলছে, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হলে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী মাস থেকেই বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। বৈঠকের আলোচনা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপরই ট্রেন চলাচল শুরুর সময় নির্ভর করবে।

রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন ট্রেনের প্রস্তাব

বন্ধ থাকা ট্রেন চালুর পাশাপাশি নতুন একটি আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগ চালুর প্রস্তাবও দেবে বাংলাদেশ। রাজশাহী থেকে কলকাতা রুটে নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর বিষয়ে আইজিআরএম বৈঠকে আলোচনা করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রাজশাহী ও এর আশপাশের অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ রুটটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নতুন ট্রেন চালু হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের কলকাতায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন একটি রেল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।

এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, পর্যটন ও পারিবারিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দুই দেশের মানুষের চলাচল আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পদ্মা সেতু হয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালানোর আগ্রহ

ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনার আগ্রহের কথাও বৈঠকে জানাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

পদ্মা সেতুকে ব্যবহার করে মৈত্রী এক্সপ্রেস পরিচালনা করা গেলে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগের কাঠামোর সঙ্গে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনের সংযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগের সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

২০২৪ সালের জুলাই থেকে বন্ধ আন্তঃদেশীয় ট্রেন

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচলে প্রভাব পড়ে। ওই বছরের ১৬ জুলাই মৈত্রী এক্সপ্রেসের চলাচল স্থগিত করা হয়। পরে ১৯ জুলাই থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসের পাশাপাশি বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলেও আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোর চলাচল আর আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর এবার আইজিআরএম বৈঠকের মাধ্যমে এসব ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হতে যাচ্ছে।

দুই দেশের যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহনও হয়ে থাকে। তবে যাত্রীবাহী আন্তঃদেশীয় ট্রেন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস পুনরায় চালু হলে দুই দেশের নাগরিকদের যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় যোগাযোগে গতি ফিরতে পারে। একই সঙ্গে রাজশাহী-কলকাতা নতুন রুটের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ধ থাকা তিনটি ট্রেন পুনরায় চালু, রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন ট্রেন এবং মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনার প্রস্তাব—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগ নতুন মাত্রা পেতে পারে।

সর্বশেষ আইজিআরএম বৈঠক নয়াদিল্লিতে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আইজিআরএম বৈঠক প্রতিবছর পালাক্রমে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের ২০ থেকে ২২ জানুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে।

কয়েক দফা তারিখ পরিবর্তনের পর এবার ঢাকায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর বন্ধ থাকা আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস নিয়ে এ বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বৈঠকে রেল যোগাযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাবের পাশাপাশি বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!