যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও বাড়ছে। এরই অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে সাময়িক পরিবর্তন ও স্থগিতাদেশ আনা হয়েছে। নতুন করে অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ পরে জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের ই-মেইলে অবহিত করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। বুধবার (২৬ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে একটি নতুন বৈশ্বিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের সঙ্গে সমন্বয় করেই অভিবাসী ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তবে এই কার্যক্রমের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা কখন থেকে পুনরায় নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট চালু হবে, সে বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
কেন অভিবাসী ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টে পরিবর্তন?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন প্রশিক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ভিসা আবেদনকারীদের আরও ব্যাপক ও ধারাবাহিকভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য কনস্যুলার কর্মকর্তাদের প্রস্তুত করা।
বিশেষ করে যেসব আবেদনকারী ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারের সরকারি সহায়তা বা জনকল্যাণমূলক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের শনাক্ত ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোই প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, ভিসা আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, সম্ভাব্য সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হতে পারে।
সাক্ষাৎকারের তারিখ পুনর্নির্ধারণের ই-মেইল
এর আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস প্রথম অভিবাসী ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে নির্ধারিত সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের কাছে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেট থেকে ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে।
নতুন সাক্ষাৎকারের তারিখ পরবর্তী সময়ে জানানো হবে বলেও আবেদনকারীদের অবহিত করা হয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের অনেকের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোরতা
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ভিসা বাতিল, গ্রিন কার্ড পুনর্মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন শ্রেণির আবেদনকারীদের অতিরিক্ত যাচাইয়ের মতো পদক্ষেপ এরই অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রশাসনের যুক্তি হলো, জাতীয় নিরাপত্তা, অভিবাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সম্পদের ওপর সম্ভাব্য চাপ কমাতে আবেদনকারীদের আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই নীতির ফলে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করা অনেক আবেদনকারীও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও ভিসা যাচাইয়ে প্রভাব ফেলছে?
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো আবেদনকারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মতাদর্শ বিবেচনার বিষয়টি।
বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ভিসা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত আবেদন নিয়ে কঠোর অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক মতপ্রকাশ বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশগ্রহণকে অভিবাসন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে মার্কিন প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের স্বার্থে আবেদনকারীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে।
আদালতের বাধার মুখেও অভিবাসন নীতি
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কয়েকটি উদ্যোগ ইতোমধ্যে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত ৭৫টি দেশের আবেদনকারীদের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিতসংক্রান্ত একটি নীতি বাতিল করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট নীতি বাস্তবায়নে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের বিষয়টি উঠে আসে।
এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির বৈধতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমন অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাদের অভিযোগ, অভিবাসীদের ওপর ব্যাপক নজরদারি, ভিসা বাতিল, আবেদন প্রত্যাখ্যান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়নের অংশ করার মতো পদক্ষেপ অভিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
সমালোচকদের আরও দাবি, কঠোর অভিবাসন নীতির ফলে শুধু অবৈধ অভিবাসীরাই নয়, বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরাও দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন।
বৈধ অভিবাসনের পথও কঠিন হচ্ছে
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প মূলত অবৈধ অভিবাসন বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও নতুন করে কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে।
বিভিন্ন ধরনের কাজের ভিসায় অতিরিক্ত ফি, কঠোর যাচাই এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন শর্ত আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে যাওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
এখন বিশ্বজুড়ে অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকারের সময়সূচিতে নতুন পরিবর্তন যুক্ত হওয়ায় আবেদনকারীদের অপেক্ষার সময় আরও বাড়তে পারে।
আবেদনকারীদের জন্য এর অর্থ কী?
বর্তমানে যাদের অভিবাসী ভিসার সাক্ষাৎকার নির্ধারিত ছিল, তাদের ক্ষেত্রে নতুন তারিখ না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সংশ্লিষ্ট মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আবেদনকারীদের ই-মেইল ও সরকারি নোটিশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন হবে।
তবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পুনর্নির্ধারণ মানেই আবেদন প্রত্যাখ্যান নয়। এটি মূলত ভিসা যাচাই প্রক্রিয়ার সময়সূচি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

