ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

সন্ধ্যায় মোদি-শি বৈঠকে গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

সন্ধ্যায় মোদি-শি বৈঠকে গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়

ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার সন্ধ্যায় বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে বৈঠকটি হওয়ার কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের ভঙ্গুর কূটনৈতিক সম্পর্কে যে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে, এই বৈঠকের মাধ্যমে তা আরও সুসংহত করার চেষ্টা করবেন দুই নেতা।

দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত উত্তেজনা, বাণিজ্য ঘাটতি, বিনিয়োগ নীতি ও কৌশলগত নিরাপত্তা নিয়ে ভারত-চীন সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে মোদি-শি বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতির পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ, ভিসা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।

সীমান্তে শান্তি ভারতের প্রধান শর্ত

ভারতের স্পষ্ট অবস্থান হলো, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলএসি সংলগ্ন এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতিই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হতে পারে।

অন্যদিকে চীন সীমান্ত বিরোধকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের বাইরে রেখে পৃথকভাবে সমাধানের পক্ষে। দুই দেশের এই ভিন্ন অবস্থানের কারণে সীমান্ত ইস্যুতে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

গত জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পরে এ নিয়ে কোর কমান্ডার পর্যায়েও বৈঠক হয়। সীমান্তে ভবিষ্যতে এ ধরনের উত্তেজনা এড়ানো, ভুল বোঝাবুঝি কমানো এবং সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদারের বিষয়টি দুই নেতার আলোচনায় আসতে পারে।

অরুণাচলের ২৭ স্থানের নাম পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি

বৈঠকে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারতের উদ্বেগও গুরুত্ব পেতে পারে। নয়াদিল্লি অরুণাচলকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে চীন অঞ্চলটির ওপর নিজেদের দাবি বজায় রেখে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার ভৌগোলিক স্থানের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি স্থানের নাম পরিবর্তনের চীনা উদ্যোগ নিয়ে ভারত তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। নয়াদিল্লি মনে করে, এ ধরনের একতরফা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি মোদি-শি বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হতে পারে।

ব্রহ্মপুত্রের উজানে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প

তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানে চীনের পরিকল্পিত বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। প্রায় ১৩৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্প নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশ ও অঞ্চলগুলোর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েছে।

ভারত চীনের কাছে প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখার দাবি জানাতে পারে। বিশেষ করে নদীর পানিপ্রবাহ, পরিবেশ এবং নিম্ন অববাহিকার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য বিনিময়ের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।

নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক কাঠামোর আলোচনা

সীমান্তে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দুই দেশের বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। সীমান্তে সেনাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক উত্তেজনা যাতে বড় সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সামরিক পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ, কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক এবং কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় রাখার ওপর জোর দেওয়া হতে পারে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতের চাপ

সীমান্তের বাইরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। ভারত ও চীনের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ভারতের বাজারে চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও পণ্যের প্রবেশ তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও ভারতীয় পণ্য চীনের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বাধার মুখে পড়ে বলে নয়াদিল্লির অভিযোগ।

এই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চীনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর দাবি জানাতে পারে ভারত। একই সঙ্গে চীন থেকে ভারতের শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে অযথা বাধা না দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠতে পারে।

চীনা বিনিয়োগ ও ভিসা নীতি

ভারতে চীনা বিনিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার বিষয়টিও ভারতের আলোচনার তালিকায় থাকতে পারে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, সৌরশক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য চীনের ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দিতে পারে নয়াদিল্লি।

সাময়িক দূরত্ব নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চেষ্টা

মোদি-শি বৈঠকের লক্ষ্য শুধু সাম্প্রতিক কূটনৈতিক দূরত্ব কমানো নয়; বরং দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যগুলো কীভাবে একটি স্থায়ী কাঠামোর মাধ্যমে মোকাবিলা করা যায়, সে পথ খোঁজাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ভারসাম্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ভিসা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন স্তরেই নতুন করে সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক ভারত-চীন সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে সীমান্তে উত্তেজনা এড়িয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়াতে দুই নেতা কতটা বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, সেটিই এখন নজরের কেন্দ্রে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!