ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার আমিনুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ২৩, ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার আমিনুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া ইউজার ডিক্লারেশন (ইউডি) ব্যবহার করে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাস, চোরাচালানে সহযোগিতা, বিএসটিআইয়ের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই পণ্য খালাস এবং অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে আমিনুল ইসলামের চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগে উত্থাপিত এসব তথ্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন অভিযোগকারী।

৩১তম বিসিএস দিয়ে চাকরিতে যোগদান

লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, মো. আমিনুল ইসলাম ৩১তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কাস্টম হাউস চট্টগ্রাম এবং ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তিনি ঢাকা কাস্টম হাউসে উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ভুয়া ইউডিতে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাসের অভিযোগ

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশগুলোর একটি হলো—বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সম্প্রতি Alien Apparels Ltd, Uranus Apparels (Pvt.) Ltd এবং QUICK APPARELS LIMITED—এই তিন প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে পণ্য খালাস করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাদের নামে বন্ড সুবিধায় পণ্য খালাস হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কুরিয়ার খাঁচায় আসা এসব পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং একজন রাজস্ব কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং পণ্য খালাসের নথিপত্র যাচাই করে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য খালাসে যোগসাজশের অভিযোগ

ঢাকা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে আমিনুল ইসলাম কাস্টমসের ‘সরকার হানিফ’ নামে পরিচিত একজন ব্যক্তির মাধ্যমে চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য খালাস কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া হানিফ ও শরিফ নামের আরও দুই ব্যক্তির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ভুয়া ইউডির মাধ্যমে পণ্য খালাসের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে আমিনুল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্যও বেরিয়ে আসতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কাস্টমসের নথি, ইউডি, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়াই শিশু খাদ্য ও প্রসাধনী খালাস

আমদানিকৃত শিশু খাদ্য ও প্রসাধনীজাত পণ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বা অনুমোদন দরকার, সেসব পণ্যও প্রভাব খাটিয়ে ছাড়পত্র ছাড়াই খালাস করা হচ্ছে।

আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এ ধরনের পণ্য খালাসের বিনিময়ে আমিনুল ইসলাম প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে গ্রহণ করেন।

তবে এ বিপুল অর্থ লেনদেনের দাবির সমর্থনে অভিযোগে কোনো ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের রেকর্ড, অডিও-ভিডিও বা অন্য কোনো নথি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘Closet Cloud’ নিয়ে নতুন প্রশ্ন

অভিযোগে ‘Closet Cloud’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন ০০৪৬৩৬২৪৪-০১০১ এবং টিআইএন ৩৮৩৬৩৭১৪৬৬০৪ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমিনুল ইসলামের একজন নিকটাত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি করে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় ‘Closet Cloud’-এর আমদানি-রপ্তানি নথি, বিল অব এন্ট্রি, পণ্যের ঘোষণা, মূল্য নির্ধারণ, শুল্ক পরিশোধ এবং মালিকানা কাঠামো যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাবিহা জাহান-এর সঙ্গে আমিনুল ইসলামের পরিবারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক কিংবা আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

সাবেক এনবিআর সদস্যের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ

অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের সদ্য সাবেক সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও এসেছে।

অভিযোগকারীর দাবি, তার প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে আমিনুল ইসলাম ঢাকা কাস্টম হাউসে বিভিন্ন অনিয়ম এবং অবৈধ পণ্য খালাসে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

তবে মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের কথিত যোগসাজশের বিষয়েও স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন

আমিনুল ইসলামের আয়কর নথি নম্বর ৭৮৬১৬৩৯৫৭২৪৭ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ঘোষিত আয়, সম্পদ ও জীবনযাপনের ধরন পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য, তার বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের তুলনায় জীবনযাপন এবং সম্পদের পরিমাণে অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। এ কারণে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তদন্তের দাবি

লিখিত অভিযোগে ভুয়া ইউডি ব্যবহার, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকি, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া পণ্য খালাস, চোরাচালানে সহযোগিতা এবং কথিত অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগগুলো আলাদাভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার দায়িত্বকালে যেসব পণ্য খালাস হয়েছে, সেগুলোর বিল অব এন্ট্রি, ইউডি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, আমদানি-সংক্রান্ত নথি, শুল্ক পরিশোধের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।

বিশেষ করে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে ইউডি ব্যবহার করে কীভাবে পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেটি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি রয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ফলে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 তবে একজন দায়িত্বশীল কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!