বিগত ১৭ বছরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না; তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
রোববার (২৩ আগস্ট) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম কর্মদিবসের মতবিনিময় শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, গত ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা ও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার দায়িত্বের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতিমুক্ত করে এর পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। গত সময়ে এই মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বিষয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো স্থান নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রচলিত আইন, বিধি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয়, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৫০টি মন্ত্রণালয় থাকলেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম অন্য অনেক মন্ত্রণালয়ের তুলনায় আলাদা। কারণ, এ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সরাসরি জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় পর্যায়ের সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তার ভাষায়, সরকারের মূল উদ্দেশ্য জনগণের সেবা করা। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর ও জনমুখী হবে।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যদি জনগণের কাছে সঠিকভাবে সেবা পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে এর সুফল শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, পুরো দেশ ও সরকার পাবে। এই লক্ষ্য নিয়েই আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’
দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, দেশের সচ্ছল মানুষ নিজেদের অনেক প্রয়োজন নিজেরাই পূরণ করতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সেবার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাদের অধিকার ও প্রয়োজন নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো না কোনোভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। বিগত ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনায় তাদের অনেকের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, সরকার অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হলেও এই ক্ষমতা সরকারের নিজস্ব নয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যাদের দায়িত্ব দেয়, তারাই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকার পরিচালনা করেন। তাই জনগণের দেওয়া ক্ষমতা জনগণের কল্যাণেই ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রে জনগণের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
নিজের রাজনৈতিক আদর্শের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম জড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ছিল, তখন জিয়াউর রহমান সাহসের সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সম্মুখ সমরে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশবাসী তাকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।
তিনি বলেন, তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়াকে নিজের জন্য একটি গুরুদায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি জনগণের সঙ্গে সরাসরি মিশে, তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে চান। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এ সময় অতীতের প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে মন্ত্রী অভিযোগ করেন, একসময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছিল এবং বিচারকদের স্বাধীনভাবে রায় লেখার সুযোগ ছিল না। মন্ত্রণালয় থেকে রায় লিখে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এমন একটি কার্যকর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে হয়রানির শিকার হবেন না। দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানো হবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সেবা করাই সরকারি দায়িত্বের মূল লক্ষ্য। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

