ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

‘যুক্তরাজ্যে ফিরব না’—সেই হ্যারি এবার পরিবার নিয়ে কেন ফিরছেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

‘যুক্তরাজ্যে ফিরব না’—সেই হ্যারি এবার পরিবার নিয়ে কেন ফিরছেন?

ছবিঃ সংগৃহীত

আবারও যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল। মাত্র ১৫ মাস আগেও হ্যারি বলেছিলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফেরার কোনো পরিস্থিতি তিনি কল্পনাই করতে পারেন না। অথচ এখন সেই অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন সাসেক্সের ডিউক ও ডাচেস। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁরা যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে পারেন এবং তাঁদের দুই সন্তান আর্চি ও লিলিবেটকে দেশটির স্কুলে ভর্তি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

হ্যারির এই সিদ্ধান্তকে শুধু পারিবারিক স্থানান্তর হিসেবে দেখছেন না রাজপরিবার পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের মতে, এর পেছনে সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে পারিবারিক শিকড়ের যোগসূত্র এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়—সবকিছুরই প্রভাব রয়েছে। তবে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে, ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্ক আদৌ কতটা বদলাবে।

যে হ্যারি বলেছিলেন, ফিরবেন না

২০২০ সালে রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান হ্যারি ও মেগান। এরপর থেকে রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়েছে। বিশেষ করে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় নিয়ে হ্যারির প্রকাশ্য মন্তব্য এবং মেগানের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা ব্রিটিশ রাজপরিবারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, নেটফ্লিক্সের ছয় পর্বের প্রামাণ্যচিত্র এবং হ্যারির স্মৃতিকথা স্পেয়ার প্রকাশের পর সেই বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়।

এক পর্যায়ে হ্যারি বলেছিলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি তিনি কল্পনা করতে পারেন না। এমনকি সন্তানদের নিজের জন্মভূমি দেখাতে না পারাকে তিনি দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেছিলেন।

এখন সেই হ্যারিই যুক্তরাজ্যে ফিরে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি বড় কারণ?

রাজপরিবার পর্যবেক্ষকদের মতে, হ্যারির সিদ্ধান্তের অন্যতম বড় কারণ তাঁর দুই সন্তান—আর্চি ও লিলিবেট। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে উঠলেও তাঁদের বাবার দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রয়েছে গভীর পারিবারিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক।

হ্যারি নিজেও অতীতে আদালতে দেওয়া বক্তব্যে সন্তানদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘ব্রিটেন আমার সন্তানদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি চাই, তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়িতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছে, যুক্তরাজ্যেও যেন ততটাই স্বাচ্ছন্দ্য ও আপন অনুভব করে।’

রাজপরিবার নিয়ে লেখা বইয়ের লেখক ও রয়্যাল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির ফেলো এড ওয়েন্সের মতে, হ্যারি ও মেগান চান তাঁদের সন্তানরা একদিকে যেমন মার্কিন সমাজে বেড়ে উঠুক, অন্যদিকে তেমনি বাবার দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও পরিচিত হোক।

এই কারণেই আর্চি ও লিলিবেটকে যুক্তরাজ্যের স্কুলে ভর্তি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চার্লসের সঙ্গে বরফ গলছে?

হ্যারির ফিরে আসার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে তাঁর বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক।

গত কয়েক বছরে বাবা ও ছেলের সম্পর্কেও যথেষ্ট দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই দূরত্ব কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলেছে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজা চার্লসের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর হ্যারি দ্রুত যুক্তরাজ্যে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরে গত বছরও বাবা-ছেলের মধ্যে সাক্ষাৎ ও চা-পানের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের গত মাসে হ্যারি ও মেগান সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে গেলে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার সঙ্গে লন্ডনের বাইরে হাইগ্রোভ হাউসে তাঁদের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ হয়।

রাজপরিবার পর্যবেক্ষকদের কাছে এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিনের তিক্ততার পর বাবা ও ছেলের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

হ্যারি এক সাক্ষাৎকারে তাঁর বাবার বয়স ও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর বাবা আর কত দিন বেঁচে থাকবেন, তা তিনি জানেন না।

ফলে চার্লসের সঙ্গে আরও সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়াও হ্যারির যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হতে পারে।

উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো কঠিন

তবে রাজপরিবারের সব সম্পর্ক যে আগের মতো হয়ে গেছে, তা নয়। বিশেষ করে হ্যারি ও তাঁর বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত জটিল।

হ্যারির স্পেয়ার বইয়ে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ নানা ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় উইলিয়াম অত্যন্ত ক্ষুব্ধ বলে বিভিন্ন সময়ে খবর এসেছে। হ্যারিও স্বীকার করেছিলেন, পরিবারের কিছু সদস্য হয়তো তাঁকে কখনোই ক্ষমা করবেন না।

রাজপরিবারবিষয়ক লেখক ক্যাথরিন মেয়ার মনে করেন, উইলিয়াম এখনো হ্যারির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য প্রস্তুত নন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও ক্ষোভ কাটিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য যে পারস্পরিক আস্থা প্রয়োজন, সেটি এখনো তৈরি হয়নি।

ফলে হ্যারি যুক্তরাজ্যে ফিরলেও ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা স্বাভাবিক হবে, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে।

নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ

যুক্তরাজ্যে ফিরে বসবাসের ক্ষেত্রে হ্যারির অন্যতম বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। রাজপরিবারের কর্মরত সদস্যের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁর সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিবর্তন করা হয়। এরপর থেকেই নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন তিনি।

এই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইও করেছেন হ্যারি। চলতি বছরের শুরুতে সেই আইনি চ্যালেঞ্জে তিনি হেরে যান।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে হ্যারি-মেগানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তাঁদের পরিবারের জন্য কী মাত্রার নিরাপত্তা প্রয়োজন, সেটি ব্যক্তিগত বিষয়।

অর্থাৎ দেশে ফিরলেও হ্যারি আগের মতো রাজপরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে সরকারি নিরাপত্তা পাবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমও বড় চ্যালেঞ্জ

হ্যারি ও মেগানের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যম।

গত এক দশকে হ্যারি যুক্তরাজ্যের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের বিষয়ে সংবাদমাধ্যম অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করেছে।

ফোনে আড়ি পাতা ও ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগের অভিযোগে দ্য ডেইলি মিরর ও দ্য সান-এর প্রকাশকদের বিরুদ্ধে করা মামলায় হ্যারি জয়ী হয়েছেন। তবে ডেইলি মেইল-এর বিরুদ্ধে ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগের একটি মামলায় তাঁর দাবি আদালতে খারিজ হয়েছে।

এখন তিনি ও মেগান যুক্তরাজ্যে ফিরলে তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ আবারও সংবাদমাধ্যমের নজরে আসবে। ফলে ব্যক্তিগত জীবন আড়ালে রাখার চেষ্টা করলেও সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

জনমতও বিভক্ত

হ্যারি–মেগানকে নিয়ে ব্রিটিশ জনমতও একেবারে একমুখী নয়। বিভিন্ন জরিপে তাঁদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটনের তুলনায় হ্যারি–মেগানের জনপ্রিয়তা কম বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে।

তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাঁদের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি।

এই পরিস্থিতিতে হ্যারি–মেগানের প্রত্যাবর্তন রাজপরিবারের জন্য ইতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে বলে মনে করেন কিছু বিশ্লেষক। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে রাজপরিবারের যোগাযোগ ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁদের উপস্থিতি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

রাজপরিবারে কি নতুন অধ্যায়ের শুরু?

হ্যারির যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্তকে অনেকে ১৯৩৬ সালে সিংহাসন ত্যাগ করা অষ্টম এডওয়ার্ডের ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে দুই ঘটনার মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। অষ্টম এডওয়ার্ড শেষ পর্যন্ত রাজপরিবার থেকে দূরে বিদেশে জীবন কাটিয়েছিলেন। হ্যারি ও মেগানের ক্ষেত্রে সেই বিচ্ছিন্নতার চিত্র বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাবা চার্লসের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে, সন্তানদের যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের বিরোধের পরও হ্যারি নিজ জন্মভূমিতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—সব মিলিয়ে রাজপরিবারের জন্য এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

তবে উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক, নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের চাপ এবং ব্রিটিশ জনগণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া—এই চারটি বিষয় হ্যারি-মেগানের প্রত্যাবর্তনকে কতটা সহজ বা কঠিন করে তোলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!