ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

তিন শীর্ষ বৈঠকের পরই দিল্লি, ঢাকার কী বার্তা নিয়ে ফিরলেন দীনেশ ত্রিবেদী?

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ১০:১৮ এএম

তিন শীর্ষ বৈঠকের পরই দিল্লি, ঢাকার কী বার্তা নিয়ে ফিরলেন দীনেশ ত্রিবেদী?

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে এক দিনের ব্যবধানে বৈঠক শেষে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে তিনি দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। এর আগে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে এবং সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

একই সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যখন নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তখন ভারতীয় হাইকমিশনারের ধারাবাহিকভাবে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক এবং বৈঠকের পরপরই দিল্লি যাত্রা কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ঢাকার নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দ্রুত নয়াদিল্লিতে পৌঁছে দিতেই হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সোমবারই দিল্লি গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যু এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে দীনেশ ত্রিবেদীর দিল্লি সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম বৈঠক

বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শুরুর প্রায় দেড় মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

বৈঠকটি অত্যন্ত ভালো হয়েছে উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আগামী দিনে আরও উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী সামনে এগিয়ে যেতে চান এবং ভারত এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু বা মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব ইস্যু থাকবে, ভারতেরও ইস্যু থাকবে। তবে মানুষের ইস্যু একটাই—দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক।

হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার বার্তা

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সেখানে তিনি জানান, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য দিল্লির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান আগেই স্পষ্ট ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় এবং তার বিভিন্ন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকে শেখ হাসিনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের প্রত্যর্পণের বিষয়েও ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তাও ঢাকার

তবে শুধু প্রত্যর্পণ বা দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বিষয় নয়, দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

অর্থাৎ, একদিকে বাংলাদেশ তার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবিগুলো স্পষ্ট করেছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কার্যকর ও ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে ঢাকা।

ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা

এদিকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে চলমান টানাপোড়েনের প্রভাব পড়তে পারে সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণের বিষয়েও।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে সেই আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত সাড়া দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাবেন কি না, সে বিষয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ফলে দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর ব্রিকস সম্মেলন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যে নতুন উত্তেজনা

বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সরাসরি মতবিনিময়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বিষয়টি আবারও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক তিনটি বৈঠক করে ভারতীয় হাইকমিশনারের দ্রুত দিল্লি যাত্রাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

দায়িত্ব নেওয়ার পর ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা

গত ২৫ জুন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এরপর গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।

এর আগে গত এপ্রিলে ভারত সরকার দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় দেশটির ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী ও রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, ভারত এর আগে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে কোনো রাজনীতিবিদকে পাঠায়নি।

নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য গত ৫ জুন পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম বৈঠক এবং তার পরপরই দিল্লি সফর—সব মিলিয়ে দীনেশ ত্রিবেদীর কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমানে কয়েকটি বিষয় একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যু, রাজনৈতিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং ভারতের আমন্ত্রণে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ।

দীনেশ ত্রিবেদীর দিল্লি সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান ও বার্তা ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে এটুকু স্পষ্ট—মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন থাকলেও ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয় পক্ষই সম্পর্ককে পুরোপুরি অচল অবস্থায় নিতে চায় না। বরং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বৈঠক ও তৎপরতা সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!