ট্রাফিক সিগন্যালের বাতি দেখে নিয়ম মেনে থামছে গাড়ি, সবুজ সংকেত পেলে এগিয়ে যাচ্ছে যানবাহন। নির্ধারিত সময় ও স্থান দিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন পথচারীরাও। রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গত কয়েক মাস ধরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের বিপরীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন চালক ও পথচারীরা।
রাজধানীর যানজট ও সড়কে বিশৃঙ্খলা কমাতে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সেমি-অটোমেটেড ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েটের) তত্ত্বাবধানে স্থাপন করা এসব সিগন্যালের কয়েকটিতে পরীক্ষামূলকভাবে যুক্ত করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরা।
প্রাথমিকভাবে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার পর এবার রাজধানীর আরও ৫০টি ইন্টারসেকশনে এ ধরনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন করে ৫০ ইন্টারসেকশনে এআই সিগন্যাল
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার ২৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার ২২টি ইন্টারসেকশনে নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সিগন্যাল পুরোপুরি চালু হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় মানুষের ওপর নির্ভরতা কমবে। যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। ফলে কোনো একটি সড়কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে থাকার প্রবণতাও কমানো যাবে।
সিগন্যাল ভাঙলেই ‘মামলার ভয়’
নতুন প্রযুক্তির সিগন্যাল নিয়ে চালকদের মধ্যেও এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। সিগন্যাল অমান্য করলে এআই ক্যামেরায় তা শনাক্ত হয়ে মামলা হতে পারে—এমন ধারণা চালকদের নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত করছে।
একজন চালক বলেন, এখন সিগন্যাল অমান্য করার আগে একটা ভয় কাজ করে—যদি এআই ক্যামেরায় ধরা পড়ে মামলা হয়ে যায়। সতর্ক থাকার জন্য বর্তমানে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন এবং এটিকে সরকারের ভালো উদ্যোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু হলে ধীরে ধীরে চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
অপারেটর ছাড়াই চলবে নতুন সিগন্যাল
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, নতুন যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। ফলে এটি পরিচালনার জন্য সবসময় আলাদা অপারেটরের প্রয়োজন হবে না।
তার ভাষায়, সিস্টেমটি ‘ডিমান্ড রেসপন্সিভ’ হওয়ায় সড়কে যানবাহনের চাপ বুঝে সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করতে পারবে। একই সঙ্গে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ প্রয়োজন হলে হাতে থাকা ট্যাবের মাধ্যমে সিগন্যালের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারবেন।
এর ফলে একদিকে যেমন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, অন্যদিকে জরুরি পরিস্থিতিতে ট্রাফিক পুলিশও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন।
রাতারাতি বদলাবে না সড়কের চিত্র
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, মানুষের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা ও অভ্যাস পরিবর্তন করে তাদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা রাতারাতি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন এবং এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তেমন কোনো বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে না। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
যেখানে সমস্যা বেশি, সেখানে এআইয়ের কার্যকারিতা কম
তবে এআই-নির্ভর ট্রাফিক সিগন্যালিং নিয়ে অভিজ্ঞতা পুরোপুরি একমুখী নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব সড়কে নির্ধারিত স্থান ছাড়া পথচারীদের রাস্তা পারাপার, ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপ বেশি, সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর সিগন্যাল ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট তারিকুল বলেন, যেখানে মানুষ যত্রতত্র রাস্তা পার হয় কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে, সেখানে এআই সিগন্যাল সিস্টেম প্রত্যাশিতভাবে কাজ করতে সমস্যায় পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিগন্যাল বসালেই রাজধানীর যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে না। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অবৈধ পার্কিং, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানামা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ব্যয়
নতুন সিগন্যাল ব্যবস্থার পাশাপাশি এগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন লোকবলও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ও বাড়ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরির কাজ চলছে। এ জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এই ইউনিট ভবিষ্যতে এআই ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার কারিগরি দিক দেখভালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রযুক্তির সঙ্গে দরকার কঠোর ব্যবস্থাপনা
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর যানজট কমাতে এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটি একক কোনো সমাধান নয়। সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহনের সংখ্যা, গণপরিবহনের শৃঙ্খলা, পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এ ছাড়া এআই ক্যামেরায় কোনো যানবাহন বা চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, প্রযুক্তির স্বচ্ছতা এবং যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীর আরও ৫০টি ইন্টারসেকশনে নতুন সিগন্যাল চালু হলে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিধি আরও বাড়বে। এখন দেখার বিষয়, সিগন্যাল ব্যবস্থার পাশাপাশি সড়কের অন্যান্য অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ঢাকার যানজট ও বিশৃঙ্খলা কতটা কমানো সম্ভব হয়।

