ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

রূপপুরে প্রথম বিদ্যুৎ আসছে না আগস্টে, আটকে বি-২ কমিশনিং লাইসেন্সে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৬, ২০২৬, ১০:০৯ এএম

রূপপুরে প্রথম বিদ্যুৎ আসছে না আগস্টে, আটকে বি-২ কমিশনিং লাইসেন্সে

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর থেকে চলতি আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার যে লক্ষ্য ছিল, তা আর পূরণ হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ/BAERA) ‘বি-২’ কমিশনিং লাইসেন্স এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগের সময়সূচি আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা, পরিদর্শন ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন মিললেই পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হবে।

 

বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

রূপপুর প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজন শুরু হয়। এরপর জ্বালানি সংযোজনসহ প্রাথমিক নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করা হয়েছে।

তবে জ্বালানি সংযোজন শেষ হলেই সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যায় না। এর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিতভাবে পারমাণবিক বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা, যাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাষায় ‘ক্রিটিক্যালিটি’ বলা হয়।

এই ধাপে যাওয়ার আগে প্রয়োজন বিএইআরএর সংশ্লিষ্ট কমিশনিং অনুমোদন। আর সেই অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত রিঅ্যাক্টরকে পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।

৯০টি নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন

রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান জানান, প্রথম ইউনিট এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর জ্বালানি সংযোজনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৯০টি নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিএইআরএর চূড়ান্ত পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বি-২ লাইসেন্স পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে না। প্রথমে রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করতে হবে। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলবে। সবকিছু সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হলে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

নিরাপত্তা যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাইসেন্স নয়

বিএইআরএর চেয়ারম্যান মো. মাহামুদুল হাসান জানিয়েছেন, এই পর্যায়ের লাইসেন্স প্রদান একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল প্রক্রিয়া। প্রকল্পের নিরাপত্তা, সম্পন্ন হওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে ঠিক কবে বি-২ কমিশনিং লাইসেন্স দেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রতিটি ধাপেই কঠোর নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন। ফলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

‘নির্দিষ্ট তারিখ বলা সম্ভব নয়’

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. কবির হোসেন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে বলেন, এটি পুরোপুরি কারিগরি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তাই এখনই নির্দিষ্ট তারিখ বলা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, ফুয়েল লোডিং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী ধাপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরে নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে। এরপর টারবাইন চালু করে জেনারেটরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং সবশেষে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

অর্থাৎ, রিঅ্যাক্টরে ফিশন শুরু থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ—পুরো প্রক্রিয়াটিই ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।

১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প

রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কেন্দ্রটিতে দুটি ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) মডেলের পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে রূপপুরের মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও বি-২ কমিশনিং লাইসেন্স না পাওয়ায় সেই সময়সূচি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার

রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে এখন মূল নজর বিএইআরএর চূড়ান্ত পরিদর্শন ও বি-২ কমিশনিং লাইসেন্সের ওপর। লাইসেন্স পাওয়ার পর ক্রিটিক্যালিটি, টারবাইন ও জেনারেটর পরীক্ষা এবং গ্রিড সংযোগের মতো ধারাবাহিক ধাপ পেরিয়ে তবেই রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন

banner
Link copied!