ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সন্দেহভাজন পাকিস্তানি নাগরিক আটক, আইএসআই-যোগের অভিযোগে তদন্ত

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬, ১১:০৮ এএম

বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সন্দেহভাজন পাকিস্তানি নাগরিক আটক, আইএসআই-যোগের অভিযোগে তদন্ত

ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সন্দেহভাজন এক পাকিস্তানি নাগরিকসহ দুজনকে আটক করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। আটক ব্যক্তিদের একজনের পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই)-এর সঙ্গে কথিত যোগাযোগ ছিল কি না এবং তিনি বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন কি না—তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তি পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের বাসিন্দা রানা রউফ, যিনি ওয়াহাব আলম নামেও পরিচিত। মঙ্গলবার রাতে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁসংলগ্ন হাবড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। একই ঘটনায় কলকাতার টপসিয়া এলাকা থেকে মোহাম্মদ এজাজ নামের আরেক ব্যক্তিকেও আটক করেছে এসটিএফ।

বাংলাদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল কি না, তদন্ত

এসটিএফের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনগাঁ সীমান্তের দিকে রানা রউফের চলাচল সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালানো হয়। তদন্তকারীদের সন্দেহ, তিনি পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পরিকল্পনা করছিলেন।

তবে বাংলাদেশে প্রবেশের উদ্দেশ্য কী ছিল কিংবা বাংলাদেশে তার কোনো সহযোগী বা যোগাযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

তদন্তকারীরা রউফের ভারতে অবস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ এবং পরিচয়পত্র ব্যবহারের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখছেন।

একাধিক ভারতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধারের দাবি

এসটিএফের দাবি, রানা রউফ ২০১২ সালে নেপাল হয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস শুরু করেন। আটকের সময় তার কাছ থেকে একাধিক ভারতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

এর মধ্যে একটি আধার কার্ডে কলকাতার টপসিয়া এলাকার ঠিকানা ছিল বলে কর্মকর্তাদের দাবি। কীভাবে একজন বিদেশি নাগরিক ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করলেন এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে কি না—এখন সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সামরিক স্থাপনায় নজরদারির অভিযোগ

তদন্তকারীদের দাবি, রানা রউফ ভারতের বিভিন্ন রেলপথ ও সশস্ত্র বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কলকাতার কয়েকটি স্পর্শকাতর স্থাপনার ওপরও নজর রাখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এসব স্থাপনার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফোর্ট উইলিয়ামও রয়েছে বলে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, রউফকে ওইসব স্থাপনার ছবি, ভিডিও ও মানচিত্র সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

মোবাইল ফোন ধ্বংসের দাবি

আটকের আগে রানা রউফ তার মোবাইল ফোন ধ্বংস করে ফেলেছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। ফলে আটকের সময় তার কাছ থেকে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা যায়নি।

তবে তার ব্যাগে থাকা একটি নোটবুক থেকে বেশ কয়েকটি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এসটিএফ। কর্মকর্তাদের দাবি, এসব নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নম্বর রয়েছে।

এ ছাড়া দুটি সিম কার্ডও উদ্ধারের কথা জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। এসব নম্বর ও সিমের মাধ্যমে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং কী ধরনের তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে।

ভারতীয় সামরিক তথ্য পাচারের সন্দেহ

এসটিএফ কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, রানা রউফ পাকিস্তানের কাছে ভারতীয় রেলওয়ে ও নৌবাহিনী-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য পাচার করে থাকতে পারেন। তবে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা পাচার করা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আইএসআইয়ের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল কি না, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং কথিত তথ্য সংগ্রহের পেছনে অন্য কোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

দ্বিতীয় আটক ব্যক্তির সঙ্গে কী সম্পর্ক?

এই মামলায় আটক দ্বিতীয় ব্যক্তি মোহাম্মদ এজাজের সঙ্গে রানা রউফের সরাসরি যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের।

এসটিএফের দাবি, ভারতে পরিচয়পত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এজাজ রউফকে সহযোগিতা করে থাকতে পারেন। তাদের সম্পর্কের প্রকৃতি, যোগাযোগের ধরন এবং এই নেটওয়ার্কে আরও কেউ জড়িত কি না—তা জানতে এজাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

আগের একটি মামলার সূত্র ধরে অভিযান

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পূর্ব বর্ধমানে একটি মামলায় আটক হামীম মণ্ডলের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য রানা রউফকে শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে পূর্ব বর্ধমানে একটি কথিত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে হামীম মণ্ডলসহ তিনজনকে আটক করেছিল এসটিএফ। অন্য দুজন ছিলেন অর্পিতা সরকার ও আদিত্য সিং।

এসটিএফের অভিযোগ, ওই ব্যক্তিদের পাকিস্তানভিত্তিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এমনকি সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহে ‘হানি ট্র্যাপ’ ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ

রানা রউফকে আটকের ঘটনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা, অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার এবং ভুয়া ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত সম্ভাব্য চক্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে পেট্রাপোল-বনগাঁ সীমান্তকে ঘিরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চলাচল এবং তাদের সম্ভাব্য আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের বিষয়টি ভারতীয় তদন্ত সংস্থাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

তবে আটক ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশের পরিকল্পনা ছিল—এসটিএফের এই সন্দেহের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

১৪ দিনের পুলিশ হেফাজত

আটকের পর রানা রউফকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে ও মোহাম্মদ এজাজকে বারাসাত আদালতে হাজির করা হলে আদালত দুজনকেই ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এখন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কথিত আইএসআই-যোগ, ভুয়া পরিচয়পত্র, সামরিক স্থাপনায় নজরদারি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে ভারতীয় তদন্ত সংস্থা।

তদন্ত এগিয়ে গেলে রানা রউফের কথিত আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রকৃতি এবং এই ঘটনায় বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশের কোনো ব্যক্তি বা নেটওয়ার্ক যুক্ত ছিল কি না—সে বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!