ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ, ফের উত্তেজনা: আত্মসমর্পণের আহ্বান ট্রাম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ, ফের উত্তেজনা: আত্মসমর্পণের আহ্বান ট্রাম্প

ছবিঃ সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করতে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) ওই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী নয়। একই সঙ্গে ইরানকে ‘সাদা পতাকা তুলে আত্মসমর্পণ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এর পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। তাঁর এসব বক্তব্যের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনের বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে।

৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছিল। বৃহত্তর একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুই পক্ষকে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়।

তবে ওই সময়সীমা শেষ হলেও দুই দেশের মধ্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি। বরং সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর উভয় পক্ষের বক্তব্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘গুরুতর’ লঙ্ঘনের কারণে নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমার এখন আর কার্যকারিতা নেই। একই সঙ্গে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য দেশটির বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহী নয় যুক্তরাষ্ট্র

সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নিতে আগ্রহী নয়।

তবে একই সময়ে তিনি দাবি করেন, ইরান এখনও আলোচনায় বসতে চায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সমস্যা হচ্ছে—তেহরান যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের চুক্তি চায়, সেই শর্তে সম্মত হতে প্রস্তুত নয়।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) চুক্তি করতে চায়। কিন্তু আমি যে ধরনের চুক্তিকে প্রয়োজনীয় মনে করি, তারা সেই ধরনের চুক্তি করবে না।’

পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কঠোর অবস্থান

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিজের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সেখানে একটি কারণেই আছি—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না এবং তাদের তা থাকবেও না।’

বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্যই ভবিষ্যৎ আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে উঠতে পারে। সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই প্রশ্নে কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে চাপ প্রয়োগের নীতি আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি নিয়েও নতুন করে বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। এর আগে প্রণালিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ধারণার কথা বলেছিলেন তিনি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এবারও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বরং তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি দারুণ একটি ধারণা।’

ট্রাম্পের দাবি, নৌ অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এটি নিয়ন্ত্রণ করছি। নৌ অবরোধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছি। আমাদের অবরোধ রয়েছে এবং এর মাধ্যমেই আমরা প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করছি।’

তবে ইরান এ অঞ্চলে কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তেল সরবরাহ ও বাজার নিয়ে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে প্রতি সপ্তাহে ওই অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন সম্ভব হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রণালিটি বর্তমানে খোলা রয়েছে এবং তেলের দাম কমছে।

তিনি বলেন, ‘প্রণালিটি খোলা আছে, তেলের দাম কমছে এবং আরও কমতে থাকবে—যদি না আমরা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’

তবে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানও তাদের অবস্থান কঠোর করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও সামরিক চাপের মুখে তারা নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।

ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে হামলার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান মুখোমুখি হলে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন মূল প্রশ্ন—ওয়াশিংটন ও তেহরান আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরবে, নাকি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাত্রা আরও বাড়বে?

ট্রাম্পের বক্তব্যে একদিকে ইরানের আত্মসমর্পণের আহ্বান এবং অন্যদিকে আলোচনার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।

তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান যতক্ষণ পর্যন্ত কাছাকাছি না আসছে, ততক্ষণ নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!