মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমে আসায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্যপতন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতির দিকে এগোচ্ছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পর বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে একদিনের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের ঝুঁকি কমার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসায় বাজারে এই পরিবর্তন এসেছে।
সোমবার (বাংলাদেশ সময়) রাত ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত লেনদেনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৮ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। আগের দিনের ৯১ দশমিক ৬৮ মার্কিন ডলার থেকে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে। প্রায় ৮ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম দাঁড়ায় ৮২ দশমিক ৩৫ মার্কিন ডলার।
উত্তেজনা প্রশমনের বার্তায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্যপতনের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি—নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এসব রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল।
গত সপ্তাহে সেই আশঙ্কার কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে প্রতি ব্যারেল ১০০ মার্কিন ডলার ছুঁয়ে যায়।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বদলে যায় পরিস্থিতি
পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে গত শুক্রবার, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন।
এরপর সোমবার তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আবারও সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করতে পারে।
ইরানও আপাতত সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রেখেছে
অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, তারা আপাতত পাল্টা সামরিক অভিযান থেকে বিরত রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ওমানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে কাজ করেছে এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমিয়েছে।
বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি
তেলের দাম কমার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি।
রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগর উপকূলে অবস্থিত ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম (সিপিসি) টার্মিনাল থেকে আবারও কাজাখস্তানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে এবং মূল্যচাপও হ্রাস পেয়েছে।
তবুও পুরোপুরি কাটেনি শঙ্কা
তবে বাজারে স্বস্তি ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো-সংশ্লিষ্ট জিজান ও ইয়ানবু জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
যদিও সৌদি সরকার কিংবা সৌদি আরামকো এখন পর্যন্ত এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

