যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত গ্রিন কার্ডধারীদের স্বামী-স্ত্রী ও ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানদের জন্য পারিবারিক অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাদের পরিবারের জন্য নির্ধারিত F2A ক্যাটাগরির চূড়ান্ত কার্যক্রমের তারিখ ২২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি গ্রিন কার্ডধারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা অনেক পরিবারের আবেদন এখন পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তবে ভিসা বুলেটিনে তারিখ এগিয়ে যাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক আবেদনকারীর ভিসা নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নয়। ব্যক্তিগত আবেদনের অগ্রাধিকার তারিখ, আবেদন অনুমোদন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, ভিসা নম্বরের প্রাপ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
কোন পরিবারের সদস্যরা এই সুবিধার আওতায়?
মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় F2A নামে পরিচিত পারিবারিক অভিবাসন শ্রেণিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিন কার্ডধারীদের—
স্বামী বা স্ত্রী এবং
২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তান
এর জন্য প্রযোজ্য।
কোনো গ্রিন কার্ডধারী তার যোগ্য স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার জন্য আবেদন করলে সেই আবেদনের একটি Priority Date বা অগ্রাধিকার তারিখ নির্ধারিত হয়। পরবর্তীতে ভিসা বুলেটিনে প্রকাশিত কাট-অফ তারিখের সঙ্গে সেই অগ্রাধিকার তারিখ মিলিয়ে আবেদনটি পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার যোগ্য কি না, তা নির্ধারণ করা হয়।
সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত কার্যক্রমের তারিখ ২২ আগস্ট ২০২৬
সেপ্টেম্বর মাসের মার্কিন ভিসা বুলেটিন অনুযায়ী, সাধারণ দেশগুলোর জন্য F2A ক্যাটাগরির Final Action Date ২২ আগস্ট ২০২৬ করা হয়েছে।
সহজভাবে বললে, যেসব আবেদনকারীর অগ্রাধিকার তারিখ নির্ধারিত কাট-অফের আগে বা সেই তারিখের মধ্যে রয়েছে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়েছে, তাদের আবেদন চূড়ান্ত ভিসা প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই অগ্রগতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ সাধারণত ভিসা বুলেটিনে আলাদা দেশভিত্তিক তালিকায় উল্লেখ না থাকলে ‘All Chargeability Areas Except Those Listed’ বা সাধারণ দেশের শ্রেণির আওতায় পড়ে। তবে প্রত্যেক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সরকারি বুলেটিন ও ব্যক্তিগত আবেদনের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
শুধু Final Action Date নয়, ভিসা বুলেটিনে Dates for Filing-এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বরের বুলেটিনে এই পারিবারিক শ্রেণির আবেদনপত্র জমা দেওয়ার তারিখের তালিকা চলমান রাখা হয়েছে।
এর অর্থ, যোগ্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে Dates for Filing এবং Final Action Date একই বিষয় নয়।
Dates for Filing মূলত কখন আবেদনকারী প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও আবেদন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে যেতে পারবেন, তা নির্দেশ করে। অন্যদিকে Final Action Date সাধারণত ভিসা নম্বর চূড়ান্তভাবে বরাদ্দের যোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
কয়েক মাসে বড় ধরনের অগ্রগতি
F2A ক্যাটাগরিতে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে।
জুলাই ২০২৬-এ সাধারণ দেশগুলোর জন্য Final Action Date ছিল ১ জানুয়ারি ২০২৫। আগস্টে তা এক লাফে এগিয়ে ২২ জুলাই ২০২৬ হয়। সেপ্টেম্বর মাসে আবার এক মাস এগিয়ে সেটি ২২ আগস্ট ২০২৬ করা হয়েছে।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কাট-অফ তারিখে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ অনেক পরিবারের কাছে এ অগ্রগতি স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশি গ্রিন কার্ডধারীদের কী করা উচিত?
যেসব বাংলাদেশি গ্রিন কার্ডধারী ইতোমধ্যে স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের প্রথমেই নিজেদের আবেদনের Priority Date পরীক্ষা করা উচিত।
এর পাশাপাশি আবেদনকারীদের দেখতে হবে—
আবেদনটি অনুমোদিত হয়েছে কি না;
ন্যাশনাল ভিসা সেন্টার (NVC) থেকে কোনো নির্দেশনা এসেছে কি না;
প্রয়োজনীয় ভিসা ফি পরিশোধ করা হয়েছে কি না;
প্রয়োজনীয় সিভিল ডকুমেন্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে কি না;
আর্থিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত আছে কি না;
আবেদনকারীর পারিবারিক সম্পর্কের প্রমাণ যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে কি না এবং
পরবর্তী ধাপে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন কি না।
আবেদনের ধরন ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু ভিসা বুলেটিনের তারিখ দেখে কোনো একটি ধাপ নিশ্চিত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ভিসা পাওয়ার আগে আরও কয়েকটি ধাপ রয়েছে
অগ্রাধিকার তারিখ বর্তমান কাট-অফের মধ্যে চলে এলেই আবেদনকারীর হাতে সঙ্গে সঙ্গে ভিসা চলে আসে না। সংশ্লিষ্ট আবেদন অনুমোদিত হওয়া এবং ভিসা নম্বরের প্রাপ্যতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
বিদেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজনীয় নথিপত্র, পারিবারিক সম্পর্কের প্রমাণ, আর্থিক সহায়তার তথ্য এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধাপ থাকতে পারে। এরপর সংশ্লিষ্ট মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে সাক্ষাৎকারের প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
আবার যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অবস্থানরত কোনো যোগ্য পরিবারের সদস্য যদি সেখান থেকেই স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করেন, সেটি Adjustment of Status-এর আওতায় পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া আলাদা হতে পারে এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগ্যতা নির্ধারিত হয়।
তারিখ আবার পিছিয়েও যেতে পারে
ভিসা বুলেটিনের তারিখ একবার এগিয়ে গেলে তা সবসময় একই গতিতে সামনে এগোবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবেদনকারীর সংখ্যা, ভিসার চাহিদা এবং নির্দিষ্ট বছরে ভিসা নম্বরের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে কাট-অফ তারিখ পরিবর্তিত হতে পারে।
কোনো কোনো পরিস্থিতিতে তারিখ স্থির থাকতে পারে, ধীরগতিতে এগোতে পারে, এমনকি প্রয়োজন হলে পিছিয়েও যেতে পারে। তাই সেপ্টেম্বরের ২২ আগস্ট ২০২৬ তারিখকে স্থায়ী বা চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তি
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক গ্রিন কার্ডধারী বছরের পর বছর অপেক্ষা করে পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ভিসা ক্যাটাগরিতে দীর্ঘ অপেক্ষা থাকায় পরিবারগুলোকে আলাদা দেশে বসবাস করতে হয়, যা তাদের জন্য সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসে F2A ক্যাটাগরির কাট-অফ তারিখে বড় অগ্রগতি হওয়ায় এসব পরিবারের অনেকেই এখন তাদের আবেদন দ্রুত পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার আশা করতে পারেন।
বিশেষ করে যাদের Priority Date বর্তমান Final Action Date-এর মধ্যে চলে এসেছে, তাদের জন্য নিজেদের আবেদনের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৭ সালের শুরুতে নতুন সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা?
বর্তমান অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে আরও কিছু আবেদনকারী পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত ভিসা প্রক্রিয়ার যোগ্য হতে পারেন। তবে ভবিষ্যতের ভিসা বুলেটিনে তারিখ কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তাই বাংলাদেশি গ্রিন কার্ডধারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভিসা বুলেটিন, ইউএসসিআইএস (USCIS) এবং ন্যাশনাল ভিসা সেন্টারের (NVC) নির্দেশনা অনুসরণ করা।
স্বস্তির খবর, তবে ভিসা নিশ্চিত নয়
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ভিসা বুলেটিনে F2A ক্যাটাগরির Final Action Date ২২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এগিয়ে আসা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি গ্রিন কার্ডধারীদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ স্বামী, স্ত্রী ও ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানদের ক্ষেত্রে অনেক আবেদন এখন চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তবে এটিকে সরাসরি ‘ভিসা নিশ্চিত’ বা ‘দ্রুত ভিসা পাওয়া যাবে’—এমন ঘোষণা হিসেবে দেখা যাবে না। প্রত্যেক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ, আবেদন অনুমোদন, ভিসা নম্বরের প্রাপ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য অভিবাসন-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে।

