বিশ্ববাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখা, জ্বালানি প্রবাহ নিরাপদ রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করেছে ব্রিকস জোট। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে শনিবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরির মতো বিষয়গুলো সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান
যৌথ ঘোষণায় ব্রিকস নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংঘাতের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে বেসামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন নেতারা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ব্রিকসের ঘোষণায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এ কারণে সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে আগের অবস্থানেই ব্রিকস
ফিলিস্তিন ইস্যুতেও নিজেদের আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে ব্রিকস। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত কাঠামো পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে জোটটি।
গাজায় ইসরাইলি সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা আনরুয়ার কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন জানানো এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেওয়ার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

ব্রিকসের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জোটটির আগের নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও আন্তর্জাতিক জলপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পশ্চিমা নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রস্তাব
ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ লক্ষ্যে অ-পশ্চিমা আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
বিশ্ববাণিজ্যে ডলারনির্ভরতা ও পশ্চিমা আর্থিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর যে আলোচনা কয়েক বছর ধরে চলছে, ব্রিকসের এই উদ্যোগকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কোনো দেশের ওপর একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেছে জোটটি। বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় পূর্বানুমেয়তা, স্থিতিশীলতা ও বহুপাক্ষিকতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাতগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অন্যতম। ব্রিকস সম্মেলনে এই খাতেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যবহার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বৈষম্য কমিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শি জিনপিংয়ের মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে উদ্বেগ
সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার ভারত সফরে এসে সম্মেলনে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সম্মেলনের একটি অধিবেশনে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পরিপন্থী এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তির এ অবস্থান ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যিক শুল্কনীতি ও বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংঘাত।
এমন পরিস্থিতিতে ব্রিকসের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা।

বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্বালানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি এবারের সম্মেলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
ব্রিকসে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্তির সময়ে এসে ব্রিকস একদিকে যেমন সম্প্রসারিত হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ। নতুন সদস্য ও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান এক নয়।
ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটের সদস্য হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে তাদের অবস্থান সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ব্রিকসের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তাগত অগ্রাধিকারেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।
ট্রাম্পের শুল্কনীতিও চাপ বাড়াচ্ছে
ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোটভুক্ত দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। ফলে ব্রিকসের সদস্যদের জন্য বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতকে একই সঙ্গে ব্রিকসের নেতৃত্ব দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অর্থনীতির সঙ্গে নিজের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকসের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে জোটটি কীভাবে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
সম্মেলনে ছিলেন বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা
নয়াদিল্লির সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরাও অংশ নেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহামেদ এবং ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রধানরাও এতে অংশ নেন।
ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা
ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এবারের ব্রিকস সম্মেলন নয়াদিল্লির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা ধরে রাখা—দুই দিক সামলাতে হচ্ছে ভারতকে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে ব্রিকসের অভিন্ন অবস্থান তৈরির দায়িত্বও ভারতের ওপর রয়েছে।
সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা শুধু মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ব্রিকসের উদ্বেগ প্রকাশের দলিল নয়; বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় জোটটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভূমিকা আরও জোরদার করার প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে এই ঐকমত্য কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

