হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একাধিক কঠোর শর্ত সামনে এনেছে ইরান। দেশটির দাবি, প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণসহ ছয়টি নির্দিষ্ট শর্ত মেনে নিতে হবে।
শনিবার (৯ আগস্ট) ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এসব শর্তের কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট নিরসনে ওয়াশিংটনকে প্রথমে তাদের নীতি ও আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।
ইরানের এই অবস্থানের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজ খুলতে ইরানের ছয় শর্ত
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তার ঘোষিত শর্তগুলো হলো—
১. হুমকি বন্ধ:
ইরান ও দেশটির কথিত পবিত্র মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সব ধরনের হুমকি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ:
ইরান এবং দেশটির আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৩. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার:
ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
৪. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ:
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৫. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার:
ইরানের ওপর আরোপিত সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. জব্দ সম্পদ মুক্ত:
যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সব সম্পদ ও অর্থ কোনো শর্ত ছাড়াই মুক্ত করে দিতে হবে।
‘শর্ত মানতে বাধ্য হবে শত্রু’
ইরানের বিপ্লবী গার্ডও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রণালী খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ‘শত্রুকে ইরানের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে।’
এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তেহরান যে হরমুজ ইস্যুতে বড় ধরনের কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করতে চাইছে, তা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা
এদিকে হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা ও চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তাঁর ভাষ্য, আলোচনাটি ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ পৌঁছেছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শুধু আলোচনার ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে না। প্রণালী পুনরায় খোলার সঙ্গে আরও কিছু শর্ত এবং জুন মাসের সমঝোতা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।
ফলে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টার পরও সংকটের দ্রুত সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই জলপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
এ কারণে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ও বীমা ব্যয়ও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রণালীতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ পড়তে পারে।
সংঘাতের পর আরও কঠোর অবস্থানে তেহরান
ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, জুন মাসে হওয়া সমঝোতা ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালীতে তেহরান নতুন করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ইরান অভিযোগ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রেখে একই সঙ্গে হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল প্রত্যাশা করা যায় না।
অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষকে আগের সমঝোতায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু ইরানের নতুন ছয় দফা শর্তে বোঝা যাচ্ছে, শুধু যুদ্ধবিরতি নয়—নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উপস্থিতি, জব্দ সম্পদ এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ বিস্তৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুর সমাধান চায় তেহরান।
ফলে হরমুজ প্রণালী পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি এখন কেবল একটি নৌপথের নিরাপত্তা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

