সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায়, কীভাবে এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনতে চালু হয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। চালুর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ওয়েবসাইটটিতে জমা পড়েছে ১ হাজার ৮২৬টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ কোটি ৩ লাখ টাকা।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের জন্য বেনামে জানানোর সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশের প্রয়োজন না থাকায় যে কেউ নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন।
ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জমা পড়া অভিযোগকারীদের মধ্যে ১৭ শতাংশ দাবি করা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে অনেকে কাজ সম্পন্ন করতে শেষ পর্যন্ত ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগে উঠে আসছে সরকারি সেবার নানা চিত্র
‘ঘুষ.সাইটে’ অভিযোগ জানাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, সেবার ধরন, আনুমানিক এলাকা, দাবি করা ঘুষের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এসব তথ্য দিতে হয়। চাইলে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণও দেওয়া যায়। উদ্যোক্তাদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লাগে দুই মিনিটেরও কম।
ইতোমধ্যে ওয়েবসাইটে সরকারি জমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়, পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন, বিআরটিএতে গাড়ির ফিটনেস, পেনশন সংক্রান্ত কাজসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ জমা পড়েছে।
চাঁদপুরের এক অভিযোগকারী জানিয়েছেন, সরকারি অধিগ্রহণ করা জমির টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে তাকে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুরেও টাকা তুলতে পারেননি।
পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনেও ঘুষ দাবির অভিযোগ
ধামরাইয়ে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করার অভিযোগও রয়েছে ওয়েবসাইটে। অভিযোগকারী জানান, তিনি শিক্ষার্থী এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। পরে ৫০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৌলভীবাজারে বিআরটিএ কার্যালয়ে গাড়ির ফিটনেস করানোর ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করার অভিযোগ এসেছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফিটনেস সংক্রান্ত বিষয় ঠিক থাকার পরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সেই টাকা পরিশোধ করেন।
পেনশন আপডেটেও অর্থ দাবির অভিযোগ
ঢাকায় পেনশন স্কিম অনলাইনে আপডেট করতে গিয়ে ২ হাজার টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন একজন। তার অভিযোগ, টাকা দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ করে দেওয়ার কথা জানানো হয়। টাকা না দিয়ে দুই মাসের বেশি অপেক্ষা করেও কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত টাকা দেওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে তার কাজ সম্পন্ন হয়।
এ ছাড়া রাজউকের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির অভিযোগও জমা পড়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগে উত্থাপিত ব্যক্তিগত দাবি বা সম্পদের তথ্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করছে না উদ্যোক্তারা।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ
বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অভিযোগের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। মাত্র তিন দিনে এ বিভাগ থেকে ৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
এরপর রয়েছে—
চট্টগ্রাম বিভাগ: ৪৩৩টি
রাজশাহী বিভাগ: ১২০টি
খুলনা বিভাগ: ১১৪টি
রংপুর বিভাগ: ৯৬টি
সিলেট বিভাগ: ৭৯টি
বরিশাল বিভাগ: ৭১টি
ময়মনসিংহ বিভাগ: ৬৩টি
অভিযোগের পাশাপাশি কোন বিভাগে কত টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে, সে তথ্যও আলাদাভাবে তুলে ধরছে ওয়েবসাইটটি।
অভিযোগ প্রকাশের আগে মডারেশন
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ওয়েবসাইটে অভিযোগ জমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হয়। অভিযোগে কারও ব্যক্তিগত তথ্য থাকলে তা বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অস্পষ্ট, আক্রমণাত্মক কিংবা ওয়েবসাইটের নীতিমালা লঙ্ঘন করে—এমন অভিযোগ প্রকাশ করা হয় না।
পর্যালোচনা শেষে অনুমোদিত অভিযোগগুলো বিভাগ, সরকারি দপ্তর, সেবার ধরন, দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘ঘুষ.সাইট’ নিজেই বলছে—ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি অভিযোগকে যাচাই করা অভিযোগ বা প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এগুলো মূলত ব্যবহারকারীদের দেওয়া অভিজ্ঞতা ও দাবি।
ব্যক্তিকে নয়, প্রবণতাকে সামনে আনাই লক্ষ্য
‘ঘুষ.সাইটের’ দুই প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন তারা।
তাদের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে শনাক্ত কিংবা অভিযুক্ত করা এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য নয়। বরং দেশের কোন সরকারি সেবা বা দপ্তর ঘিরে কত বেশি ঘুষ দাবির অভিযোগ আসছে, কী পরিমাণ অর্থ দাবি করা হচ্ছে এবং মানুষ ঘুষ দিতে রাজি হচ্ছে কি না—এসবের একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।
নিজস্ব অর্থায়নে চলছে প্ল্যাটফর্ম
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ‘ঘুষ.সাইট’ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই এবং বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি। ওয়েবসাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তাদের মতে, সময়ের সঙ্গে যদি আরও বেশি মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা জানান, তাহলে সরকারি সেবায় ঘুষের ধরন, কোন দপ্তর বা সেবায় অভিযোগ বেশি, কী পরিমাণ অর্থ দাবি করা হচ্ছে এবং কোথায় মানুষ ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন—এসব বিষয়ে একটি বড় তথ্যভাণ্ডার তৈরি হতে পারে।
মাত্র তিন দিনের তথ্যেই যেখানে ১ হাজার ৮২৬টি অভিযোগ এবং ২১ কোটি ৩ লাখ টাকার ঘুষ দাবির হিসাব সামনে এসেছে, সেখানে এই প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যতে সরকারি সেবায় অনিয়ম ও ঘুষের প্রবণতা পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

