ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

বালিশকাণ্ড’ ছাপিয়ে নতুন কেলেঙ্কারি: পাবনা মেডিকেল কলেজ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ২, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

বালিশকাণ্ড’ ছাপিয়ে নতুন কেলেঙ্কারি: পাবনা মেডিকেল কলেজ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পের বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’-এর পর আবারও পাবনার সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে মূল টেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত কাজকে পুনরায় ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নতুন দরপত্র আহ্বান, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল উত্তোলন এবং বাস্তবে কাজ না করেই প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র, টেন্ডার নথি এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে পরিকল্পিতভাবে টেন্ডার বিভাজনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলা আধুনিক ভবন নির্মাণের জন্য ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রে কাজ পায় সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত হলেও বর্তমানে ভবনের মাত্র নবম তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে।

কিন্তু ভবনের মূল নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই গত ২৮ জানুয়ারি ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ বা অবশিষ্ট কাজের নামে নতুন করে ছয়টি আলাদা টেন্ডার আহ্বান করা হয়।

পিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী, একই প্রকল্পের কাজ অযৌক্তিকভাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পৃথক দরপত্র আহ্বান করা আইনসম্মত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কেনাকাটা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন এড়াতে এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে এমন কৌশল অবলম্বন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পেও একই কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। প্রতিটি দরপত্রের মূল্য পাঁচ কোটি টাকার নিচে রাখা হয়েছে, যাতে উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের প্রয়োজন না পড়ে।

বাস্তবে কাজ নেই, বিল পরিশোধ সম্পন্ন

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টেন্ডার আইডি-১২১৭৬৫০-এর আওতায় হাসপাতালের ‘এ’ ব্লকের খোলা ছাদে কাচ স্থাপনের কাজের জন্য ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এই কাজ পায় টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নগর গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দ্বীন ইসলামের মালিকানাধীন এসএ এন্টারপ্রাইজ।

অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের পুরো বিল পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে এমন কোনো কাচের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।

দ্বীন ইসলামও স্বীকার করেছেন, তিনি তার ঠিকাদারি লাইসেন্স অন্য একজনের ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন। তবে কাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।

মূল টেন্ডারের কাজ আবার নতুন টেন্ডারে

টেন্ডার আইডি-১২১৭৬১২-এর মাধ্যমে অতিরিক্ত আরসিসি ও ভিত্তি ইটের দেয়াল নির্মাণের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজটি পায় মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন।

একই প্রতিষ্ঠান টেন্ডার আইডি-১২১৭৬২৭-এ আরও প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকার কাজ পায়, যেখানে অতিরিক্ত ওভারহেড জলাধার ও শাটারিংয়ের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজ মূল ৩০০ কোটি টাকার টেন্ডারের মধ্যেই ছিল। এরপরও নতুন করে দরপত্র দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

ভিনাইল ফ্লোরিং ও ইপোক্সি পেইন্টেও অনিয়ম

টেন্ডার আইডি-১২১৭৬১৬-এ হাসপাতালের ল্যাবরেটরি, অপারেশন থিয়েটার (ওটি), আইসিইউ এবং অন্যান্য কক্ষে ভিনাইল ফ্লোরিং ও ইপোক্সি পেইন্টের জন্য প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এই কাজ পায় বন্ধু কনস্ট্রাকশন।

একই প্রতিষ্ঠান টেন্ডার আইডি-১২১৭৬২০-এর মাধ্যমে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকার ইটের কাজের দরপত্রও পায়। অথচ এই কাজও মূল নির্মাণ চুক্তির অংশ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

মসজিদ, সাবস্টেশন ও মর্গ নির্মাণ মাত্র আড়াই কোটিতে!

টেন্ডার আইডি-১২১৭৫৯৬-এ মসজিদ, টিচিং মর্গ, মর্চুয়ারি, গেট হাউস, সিকিউরিটি পোস্ট, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, পাবলিক টয়লেট, পাম্প হাউস ও জেনারেটর ভবন নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এত বড় কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৪৫ লাখ ৬২ হাজার ১৫১ টাকা।

নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এত কম ব্যয়ে এসব অবকাঠামো নির্মাণ বাস্তবসম্মত নয়।

একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পুরো টেন্ডার

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন করে আহ্বান করা ছয়টি টেন্ডারের কার্যক্রমের পেছনে মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধার শাহাদাত হোসেনের।

অভিযোগ অনুযায়ী, নামমাত্র কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টেন্ডার হলেও বাস্তবে একই সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে।

কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ উঠেছে, পুরো অনিয়মে পাবনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাউদুদুর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবিরের ভূমিকা রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

যা বলছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা

গণপূর্ত অধিদপ্তরের পপুলেশন প্রজেক্ট সেলের (পিপিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম সোহরাওয়ার্দী বলেন,

"আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ডা. আমজাদুল হক বলেন,

"সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রকল্প অফিস থেকে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

তদন্তের দাবি

সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্পটির সব টেন্ডার, বিল ভাউচার, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই (Measurement Book), বিল পরিশোধের নথি এবং প্রকৃত কাজের অগ্রগতি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের পৃথক তদন্ত প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

উল্লেখ্য: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বা তারা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আদালত দেয়নি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!