ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের জন্য সার্বজনীন উপবৃত্তি কর্মসূচি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মানসম্মত ‘মিড-ডে মিল’ চালুর লক্ষ্যে দেশের দুটি জেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’-এর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্বকালে এসব নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে ট্রাস্টের বর্তমান কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকটের কারণে যাতে পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মেয়েদের সার্বজনীন উপবৃত্তি ফেরানোর উদ্যোগ
বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে চালু হওয়া মেয়েদের সার্বজনীন উপবৃত্তি কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই কর্মসূচির ফলে বিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য সার্বজনীন উপবৃত্তি কার্যক্রম পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয়, কতসংখ্যক শিক্ষার্থীকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা যাবে, উপকারভোগী নির্বাচনের কাঠামো এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঝরে পড়া রোধে আর্থিক সহায়তায় গুরুত্ব
বৈঠকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে আর্থিক সংকটের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াতসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যয় অনেক সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ ধরনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের কার্যক্রম আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। উপবৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা গেলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হারও কমানো সম্ভব হবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
ছেলেদের জন্যও মেধাভিত্তিক উপবৃত্তির প্রস্তাব
শুধু মেয়েদের উপবৃত্তির বিষয়েই নয়, ছেলেদের শিক্ষায় উৎসাহিত করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও শিক্ষাগত ফলাফলের ভিত্তিতে ছেলেদের উপবৃত্তি দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে মেয়েদের সার্বজনীন উপবৃত্তি পুনরায় চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ব্যয়, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিল
শিক্ষার্থীদের শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই নয়, তাঁদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা খাবার নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত হতে হবে। খাবারের গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না বলেও নির্দেশনা দেন তিনি।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে কার্যকর পদ্ধতি নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মিড-ডে মিল পরিচালনার দুটি বিকল্প পদ্ধতির কার্যকারিতা, ব্যয়, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামো যাচাই করতে দেশের দুটি পৃথক জেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর পরিসরে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের কার্যক্রম পর্যালোচনা
বৈঠকে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’-এর চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা ধরে রাখা যায় এবং ঝরে পড়া কমানো যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।
শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে উপবৃত্তির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন
বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন উপবৃত্তি কর্মসূচির সম্ভাব্য ব্যয়, উপকারভোগীর সংখ্যা ও শিক্ষাগত প্রভাব এবং মিড-ডে মিলের পাইলট প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত কাজ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমানো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

