সংসারে অভাব। পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় বই-খাতা কেনাও কঠিন। ঘরে নেই পড়ার টেবিল, নেই আলাদা পড়ার জায়গা। কখনো বিছানায়, কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়তে হয়েছে। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে দিনাজপুরের স্কুলছাত্রী সাদিয়া আফরিন।
সাদিয়ার এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম। তবে তিনি শুরুতে সাদিয়ার পরিবারকে শুধু আর্থিক সহায়তা দেননি। বরং মেয়েটির পড়াশোনার আগ্রহ বুঝে তাকে নিয়মিত পড়াশোনার রুটিন তৈরি করে দেন, প্রতি সপ্তাহে বাড়ির কাজ দেন এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডেকে সেই পড়া শুনতেন।
এক সপ্তাহের পড়া থেকে শুরু হওয়া সেই নিয়মিত চর্চা ধীরে ধীরে মাস পেরিয়ে এক বছরে গড়ায়। শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সাদিয়ার নামের পাশে উঠে আসে জিপিএ–৫।
আর্থিক সহায়তা চাইতে গিয়ে পেল পড়াশোনার দায়িত্ব
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া আফরিন। স্থানীয় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সে। সাদিয়ার বাবা মো. সেলিম একজন চালকল শ্রমিক। মা আরফা বেগম সংসারের কাজের পাশাপাশি বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। তিন মেয়ের সংসারে সীমিত আয়ে পড়াশোনার খরচ চালানো ছিল পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে গত বছর জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন সাদিয়ার মা আরফা বেগম। আবেদনের পর সাদিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি।
সেদিন জেলা প্রশাসক সাদিয়ার পড়াশোনা, স্কুল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু প্রথম সাক্ষাতেই শুধু টাকা দিয়ে বিষয়টি শেষ করেননি তিনি। বরং সাদিয়ার মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ আছে কি না, সেটি বোঝার চেষ্টা করেন।
এরপরই শুরু হয় ভিন্ন ধরনের এক উদ্যোগ।
সপ্তাহের পড়া নিয়ে ডিসির কাছে হাজির
জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে সাত দিনের পড়া ঠিক করে দেন। পাশাপাশি প্রতিদিন কীভাবে সময় ভাগ করে পড়তে হবে, সেটিও নির্ধারণ করে দেন।
নির্দেশনা ছিল—রাতে দুই ঘণ্টা ও ভোরে দুই ঘণ্টা পড়তে হবে। রাত ১০টার মধ্যে ঘুমাতে হবে এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠতে হবে। বিকেলে খেলাধুলার জন্যও সময় রাখতে হবে। স্কুলে ক্লাস হোক বা না হোক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হবে।
প্রতি বুধবার গণশুনানির দিন সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে আগের সপ্তাহের পড়া বুঝিয়ে দিতে বলা হয় সাদিয়াকে।
সাদিয়াও সেই দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়। সপ্তাহের নির্ধারিত পড়া শেষ করে নিয়মিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে শুরু করে সে। মানুষের নানা অভিযোগ ও সমস্যা নিয়ে গণশুনানি চলার মধ্যেই সুযোগ বুঝে সাদিয়ার পড়া শুনতেন জেলা প্রশাসক। ভুল হলে সংশোধন করে দিতেন, আবার নতুন সপ্তাহের পড়া দিয়ে বাড়ি পাঠাতেন।
এভাবেই একটি আর্থিক সহায়তার আবেদন ধীরে ধীরে পরিণত হয় নিয়মিত পড়াশোনার একটি অনুশীলনে।
একসময় আর্থিক সহায়তাও পেল
জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে প্রথম দিকে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেন। রুটিন মেনে চললে কয়েক মাস পর আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দেন। তবে এর আগেই পরের মাসে তাকে সাত হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
সাদিয়ার পরিবারের জন্য এই অর্থ যেমন প্রয়োজনীয় ছিল, তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে নিয়মিত পড়াশোনার প্রতি জেলা প্রশাসকের নজরদারি ও উৎসাহ।
সাদিয়া পরে বলেছে, প্রথম দিকে জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে পড়া দিতে ভয় লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে ভয় কেটে যায়। নিয়মিত পড়া তৈরি করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
অভাবের সংসারে নেই পড়ার টেবিলও
গত শনিবার সাদিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আলাদা কোনো সড়ক নেই। অন্যের লিচুবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় টিনের ছাপরার ওই বাড়িতে।
মাত্র দুই শতক জমির ওপর নির্মিত ঘরটি বেড়া দিয়ে দুই ভাগ করা। এক পাশে বাবা-মা ও ছোট বোনের থাকার জায়গা, অন্য পাশে সাদিয়া ও তার মেঝ বোনের থাকার জায়গা।
ঘরে নেই কোনো পড়ার টেবিল। একটি আলমিরার ওপর রাখা সাদিয়ার বইপত্র। কখনো বিছানায়, আবার কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়তে হয়েছে তাকে।
বাড়ির পাশেই ছোট্ট রান্নাঘর। টিনের চালে লতাপাতার মধ্যে ঝুলছে চালকুমড়া। এই সাধারণ পরিবেশ থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সাদিয়া।
স্কুলে ৪৩ জনের মধ্যে জিপিএ–৫ একমাত্র সাদিয়া
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে ৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ২২ জন। আর পুরো বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে একমাত্র সাদিয়া আফরিনই পেয়েছে জিপিএ–৫।
ফল প্রকাশের পর সাদিয়ার পরিবারে নেমে আসে আনন্দের ঢেউ। মেয়ের সাফল্যে খুশি বাবা-মা। আনন্দের পাশাপাশি মেয়ের ভবিষ্যৎ পড়াশোনা কীভাবে চালাবেন—সেই চিন্তাও রয়েছে তাদের।

সাদিয়ার মা আরফা বেগম বলেন, তিনি নিজে বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু কষ্ট হলেও মেয়েদের পড়াশোনা করাতে চান। মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন। জেলা প্রশাসক শুধু অর্থ দিয়ে নয়, নিয়মিত পড়া দেওয়া ও খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে মেয়েকে সহযোগিতা করেছেন।
‘সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন’
সাদিয়ার সাফল্যে খুশি তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলীও। তিনি জানান, সাদিয়া বিদ্যালয় থেকে একমাত্র জিপিএ–৫ পেয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বিভিন্ন সময় বিদ্যালয়ে যেতেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতেন। সাদিয়ার পড়াশোনার প্রতিও তিনি বিশেষ নজর রাখতেন।
ফল প্রকাশের পর সাদিয়াকে নিয়ে পরিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে জেলা প্রশাসক তাকে অভিনন্দন জানান এবং মিষ্টিমুখ করান।
জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলে তার মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। সে কারণেই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়া সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিয়মিত হোমওয়ার্ক করেছে এবং রুটিন মেনে চলেছে।
তিনি আরও বলেন, এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের পড়াশোনার আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় বই-খাতা বা আর্থিক সামর্থ্য নেই। দিনাজপুরের বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিবছর নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘মেয়েটা অনেক দূর পড়তে চায়, কিন্তু কতদূর পারব জানি না’
সাদিয়ার বাবা মো. সেলিম মেয়ের সাফল্যে আনন্দিত। তবে মেয়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে তার মধ্যে দুশ্চিন্তাও রয়েছে। চালকলের শ্রমিক হিসেবে সীমিত আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় পড়ানো তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবু সাদিয়া থামতে চায় না। ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবারের অভাব ঘোচাতে চায় সে। মা-বাবার পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে।
সাদিয়া বলে, “স্যারের কাছে পড়া দিতে প্রথম দিকে ভয় পেতাম। কিন্তু পড়াগুলো নিয়মিত করতাম। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্যার আমাকে অনেক সাহস দিয়েছেন।”
সাদিয়ার গল্পটি তাই শুধু একটি জিপিএ–৫ পাওয়ার গল্প নয়। সীমিত সামর্থ্য, অনুকূল পরিবেশের অভাব এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও একজন শিক্ষার্থীর প্রতি নিয়মিত নজরদারি, উৎসাহ ও সঠিক দিকনির্দেশনা কীভাবে তার সম্ভাবনাকে সাফল্যে রূপ দিতে পারে—সাদিয়ার ফলাফল তারই একটি উদাহরণ।

