এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের পর এবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাসও আগেভাগে শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ২ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন ভর্তি আবেদন শুরু হয়ে চলবে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সব প্রক্রিয়া শেষ করে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী ভর্তি কার্যক্রমের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত নয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে একাদশ শ্রেণির ভর্তি নীতিমালা ও বিস্তারিত সময়সূচি প্রকাশ করা হবে।
আগের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন
এর আগে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু এবং ভর্তি কার্যক্রম শেষে ১২ নভেম্বর ক্লাস শুরুর প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই দীর্ঘ সময়সূচিতে সম্মতি দেয়নি।
শিক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, এসএসসি ফল প্রকাশের পর দ্রুত কলেজে ভর্তি সম্পন্ন করা এবং একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতেই সময়সূচি এগিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি সংশোধিত প্রস্তাবে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আবেদন গ্রহণের কথা জানিয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবেদন, ফল প্রকাশ, নিশ্চয়ন ও ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে ক্লাস শুরু হবে।
ভর্তি হবে অনলাইনে, পরীক্ষা নয়
আগের মতো এবারও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে। কোনো কলেজে আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না।
কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন নেওয়ার পর শিক্ষার্থীর এসএসসি বা সমমানের ফলাফল, পছন্দক্রম এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোটা বিবেচনা করে কলেজে ভর্তির জন্য মনোনয়ন দেওয়া হবে।
ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য পছন্দক্রম নির্ধারণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভালো ফল করলেও পছন্দের কলেজে আসনসংখ্যা সীমিত থাকায় সবাই প্রথম পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ নাও পেতে পারে।
এবার আবেদনের নিয়মেও পরিবর্তন
ভর্তি প্রক্রিয়ায় এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের বছরগুলোতে শিক্ষার্থীরা একাধিক ধাপে আবেদন করার সুযোগ পেলেও এবার প্রথম পর্যায়ে একবারই অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একবার আবেদন করার কারণে আগের মতো স্বয়ংক্রিয় মাইগ্রেশনের সুযোগও থাকছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাই আবেদনের সময় কলেজের পছন্দক্রম নির্ধারণে শিক্ষার্থীদের আরও সতর্ক হতে হবে।
তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় আবেদনের সুযোগ রাখা হচ্ছে। যেমন—পুনর্নিরীক্ষণের মাধ্যমে ফল পরিবর্তন হলে, কোনো শিক্ষার্থী কলেজে নিশ্চয়ন না করলে, কোনো কারণে কলেজ না পেলে কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় বাদ পড়লে পরবর্তী সময়ে আবার আবেদনের সুযোগ পাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
পুনর্নিরীক্ষণের ফল পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সুযোগ
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের পর কোনো শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হলে তার নতুন ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে আবার ভর্তির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কলেজ পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রক্রিয়া রাখা হবে। তাদের একাডেমিক কার্যক্রমও দ্রুত শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পুনর্নিরীক্ষণের পর কলেজ পরিবর্তন করা শিক্ষার্থীদের ১ অক্টোবরের মধ্যে ক্লাসে যুক্ত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
কেন এত দ্রুত ভর্তি ও ক্লাস?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একাদশ শ্রেণিতে ক্লাস শুরুর ক্ষেত্রে গত কয়েক বছর ধরে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাধারণত বছরের মাঝামাঝি সময়েই একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এসএসসি পরীক্ষা, ফল প্রকাশ ও ভর্তি প্রক্রিয়ার কারণে তা অনেক পিছিয়ে যায়।
গত বছর এসএসসির ফল প্রকাশ হয়েছিল ১০ জুলাই এবং পরবর্তী ভর্তি কার্যক্রম শেষে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হয় ১৫ সেপ্টেম্বর। এবার এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ হয়েছে ১০ আগস্ট। ফলে গত বছরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দ্রুত ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ক্লাস শুরু করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, একাদশ শ্রেণির ভর্তি নীতিমালা নিয়ে কাজ চলছে এবং সংশোধিত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় নেবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একাডেমিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই নিয়মিত ক্লাসে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ভর্তি ও ক্লাস শুরুর সময় এগিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবারও খালি থাকবে বিপুলসংখ্যক আসন
এবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নিয়ে আসন সংকটের চেয়ে বরং বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী ছিল। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
অন্যদিকে, সারাদেশে কলেজ ও মাদরাসা মিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। অর্থাৎ মোট আসনের অর্ধেকেরও বেশি খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আসন বেশি থাকলেও পছন্দের কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের নামী কলেজগুলোতে আসনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নিশ্চয়তা থাকবে না।
পছন্দক্রম নির্ধারণেই বড় চ্যালেঞ্জ
ভর্তি প্রক্রিয়ায় এবার মাইগ্রেশনের সুযোগ সীমিত বা না থাকায় শিক্ষার্থীদের আবেদনের সময় কলেজের পছন্দক্রম ঠিকভাবে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলাফল, আসনসংখ্যা, কলেজের চাহিদা এবং শিক্ষার্থীর পছন্দ—সবকিছুর সমন্বয়েই ভর্তির ফল নির্ধারিত হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়সূচি দ্রুত এগিয়ে আনা হলে শিক্ষার্থীরা যেমন দ্রুত একাডেমিক জীবনে ফিরতে পারবে, তেমনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাবর্ষও নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি রাখা সম্ভব হবে। তবে অনলাইন আবেদন, ফল প্রকাশ, নিশ্চয়ন ও ভর্তি—প্রতিটি ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে ২ সেপ্টেম্বর আবেদন শুরু, ১০ সেপ্টেম্বর আবেদন শেষ এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ক্লাস শুরুর মাধ্যমে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে আসবে। এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অপেক্ষা চূড়ান্ত ভর্তি নীতিমালা ও সময়সূচি প্রকাশের।

