নরসিংদীর নাছিমা কাদের মোল্লা হাই স্কুলের সাম্প্রতিক এসএসসি ফলাফল নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি গুরুতর প্রশ্নও উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ৩৮২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে—এমন ফলাফল নিঃসন্দেহে নজরকাড়া। কিন্তু এই শতভাগ সাফল্যের পেছনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মূল পরীক্ষার বাইরে রাখার অভিযোগ সত্য কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
অভিযোগ উঠেছে, এবারের এসএসসি পরীক্ষার আগে প্রতিষ্ঠানটির টেস্ট পরীক্ষায় প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৮২ জন কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করলেও ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, টেস্ট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে পরীক্ষার ফরম পূরণ ও বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
যদি অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—৩৮২ জনের শতভাগ জিপিএ-৫ কি পুরো ব্যাচের প্রকৃত চিত্র, নাকি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বাছাইয়ের মাধ্যমে তৈরি একটি ‘শতভাগ সাফল্যের’ পরিসংখ্যান?

দশ বছর পড়েও বোর্ড পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো—কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলেও টেস্ট পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না করায় একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি।
একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে তার শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারণ একটি বছর নষ্ট হওয়া শুধু পরীক্ষায় বসতে না পারার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, বয়স, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক ব্যয়ের মতো নানা বিষয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে শিক্ষা বোর্ডের নথি, পরীক্ষার্থীদের তালিকা, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল, ফরম পূরণের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শতভাগ জিপিএ-৫, কিন্তু বাকি শিক্ষার্থীরা কোথায়?
একটি বিদ্যালয়ের ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩৮২ জনই জিপিএ-৫ পাওয়া নিঃসন্দেহে অসাধারণ ফলাফল। কিন্তু একই সময়ে যদি ওই প্রতিষ্ঠানের আরও ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েও বোর্ড পরীক্ষায় না বসে থাকে, তাহলে শুধু পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জনের ফল দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাগত সাফল্য মূল্যায়ন করা কতটা যৌক্তিক—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শিক্ষাবিদদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য শুধু জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে কতটা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, ঝরে পড়া রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উপযোগী করে তোলা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
‘জিপিএ-৫ না পেলে পরীক্ষায় নয়’—নীতিটি কতটা গ্রহণযোগ্য?
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের কথিত একটি নীতি—টেস্ট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পেলে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
এমন কোনো লিখিত নীতিমালা প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে অনুসরণ করে থাকলে তার আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ টেস্ট পরীক্ষা মূলত শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি যাচাই ও দুর্বলতা শনাক্ত করার একটি ধাপ। সেখানে কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে আরও প্রস্তুত করে মূল পরীক্ষার জন্য তৈরি করার পরিবর্তে সরাসরি বাদ দেওয়া হলে শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে যারা বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছে, তাদের ক্ষেত্রে টেস্টের ফলাফলকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে চূড়ান্ত পরীক্ষার সুযোগ সীমিত করার অভিযোগ থাকলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নজরে আনা জরুরি।
চাপের মুখে শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরা?
অভিযোগ রয়েছে, ভালো ফলাফল ধরে রাখতে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ দেওয়া হয়। টেস্ট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ব্যর্থতার ভয়, পরীক্ষায় বসতে না পারার আশঙ্কা এবং কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কেবলমাত্র নিজেদের ফলাফল ও সুনাম ধরে রাখার জন্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার বাইরে রাখে, তাহলে সেটি শিক্ষার্থীর স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—এ প্রশ্নও সামনে আসে।
প্রশাসনের তদন্তেই পরিষ্কার হতে পারে প্রকৃত চিত্র
নাছিমা কাদের মোল্লা হাই স্কুলের শতভাগ জিপিএ-৫-এর তথ্য সত্য হলেও এর পেছনে কতজন শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, কতজন ফরম পূরণ করেছে এবং কতজন বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে পুরো চিত্র স্পষ্ট হবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা—প্রতিষ্ঠানের টেস্ট পরীক্ষার ফল, এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের তালিকা এবং বোর্ড পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মিলিয়ে দেখা। এতে বোঝা যাবে, শতভাগ জিপিএ-৫ আসলেই পুরো শিক্ষার্থীসমাজের অর্জন, নাকি নির্বাচিত একটি অংশের ফলাফল।
সাফল্য হোক শিক্ষার্থীদের, শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়
একটি বিদ্যালয়ের শতভাগ জিপিএ-৫ অবশ্যই আনন্দ ও গর্বের বিষয়। কিন্তু সেই সাফল্য যদি দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু মেধাবীদের আরও ভালো ফল করানো নয়; পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়া, তাদের ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করাও শিক্ষার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তাই নাছিমা কাদের মোল্লা হাই স্কুলের ৩৮২ জনের শতভাগ জিপিএ-৫-এর পাশাপাশি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া বলে অভিযোগ করা ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগটি সত্য হলে দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আর অভিযোগ সত্য না হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর জবাব।
তবে এ প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শিক্ষা বোর্ডের নথি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই ছাড়া অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

