নরসিংদীর মাধবদীতে মাত্র দুই মাস বয়সী এক শিশুর পা মুচড়ে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচিত প্রধান অভিযুক্ত চাচি ফারজানা আক্তার লতা বেগম (৩২)-কে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১১। পারিবারিক বিরোধের জেরে সংঘটিত এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন লতা বেগম।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব-১১ নরসিংদী ক্যাম্পের অধিনায়ক মো. আরিফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ভাইরাল ভিডিওটি প্রকাশের পর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে র্যাব। গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আত্মগোপনে থাকা লতা বেগমের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে রূপগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে মাধবদী থানায় হস্তান্তর করা হবে।
ভাইরাল ভিডিওতে উঠে আসে নির্মমতা
গত ১৪ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকা দুই মাস বয়সী শিশু রিজিকের একটি পা জোরে মুচড়ে দেন তার চাচি। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
পরে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলার উদ্যোগ নেয়।
শিশুর মা গোপনে ভিডিও ধারণ করেন
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার মাধবদী থানার আমদিয়া ইউনিয়নের পাইকারদী গ্রামের বাসিন্দা মো. জহির ও সাইফা আক্তার দম্পতির সন্তান রিজিক জন্মের পর থেকেই অসুস্থ ছিল। প্রায় দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কারণে শিশুটির মা সংসারের বিভিন্ন কাজে অংশ নিতে পারতেন না। এ নিয়ে একই পরিবারের সদস্য ও শিশুর চাচি লতা বেগম প্রায়ই কটূক্তি করতেন। এতে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়।
গত ১১ জুলাই বিকেলে শিশুটিকে বিছানায় শুইয়ে রেখে তার মা সাইফা আক্তার ওয়াশরুমে যান। যাওয়ার আগে সন্দেহবশত নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও রেকর্ডিং চালু করে রেখে যান। সেই সুযোগে ঘরে ঢুকে শিশুটির পা মুচড়ে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেন লতা বেগম। পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণ হয়ে যায়।
ভিডিও মুছে ফেলার চেষ্টা

অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর শিশুর চাচা কাওছার আহমেদ এবং লতা বেগমের বাবা আলমাছ মিয়া ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তারা লতা বেগমকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন এবং শিশুর মায়ের মোবাইল থেকে ভিডিওটি মুছে ফেলেন।
তবে এর আগেই শিশুর মা ভিডিওটি তার ভাই ইব্রাহিমের কাছে পাঠিয়ে রাখায় সেটি সংরক্ষিত থাকে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
পরিবারের অভিযোগ না থাকলেও রাষ্ট্র করল মামলা
ঘটনার পর শিশুটির বাবা-মা দাবি করেন, এটি পারিবারিকভাবে মীমাংসা হয়ে গেছে এবং শিশুর কোনো হাড় ভাঙেনি। তারা অভিযুক্তকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বলেও জানান। তাদের ভাষ্য, শিশুটি বর্তমানে সুস্থ রয়েছে এবং চিকিৎসকদের মতে তার পায়ে গুরুতর কোনো আঘাত পাওয়া যায়নি।
তবে ভিডিওতে শিশুর ওপর নির্মম আচরণের প্রমাণ পাওয়ায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গত ১৪ জুলাই রাতে নরসিংদীর প্রবেশন কর্মকর্তা রিজিয়া আক্তার বাদী হয়ে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় লতা বেগমকে। এছাড়া তার স্বামী কাওছার আহমেদ এবং বাবা আলমাছ মিয়া-কেও আসামি করা হয়।
আগেই গ্রেপ্তার হন দুই আসামি
মামলা দায়েরের পর পুলিশ লতা বেগমের স্বামী কাওছার আহমেদ ও বাবা আলমাছ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তবে ঘটনার পর থেকেই লতা বেগম পলাতক ছিলেন। অবশেষে র্যাবের অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হন।
পুলিশের বক্তব্য
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, শিশুর বাবা-মা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে না চাইলেও ভিডিওতে নির্যাতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। পরিবারের দাবি অনুযায়ী শিশুর পা ভাঙেনি, তবে তদন্তে ভিডিওর ভিত্তিতে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণের ঘটনায় আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

