ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

বহুল আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ, ভাগ্য নির্ধারণ ১৬ আসামির

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৬, ১০:০৭ এএম

বহুল আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ, ভাগ্য নির্ধারণ ১৬ আসামির

ছবিঃ সংগৃহীত

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স), আপিল ও জেল আপিলের রায় আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) ঘোষণা করবেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন।

২০১৯ সালে নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

শুনানি শেষ, আজ রায়

নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট হাইকোর্টে শুনানি শেষ হয়। এখন আদালত রায় ঘোষণা করবেন।

আসামিদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।

শুনানিতে মামলার সাক্ষ্য, আলামত, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারিক আদালতের রায় এবং মৃত্যুদণ্ডের আইনগত ভিত্তি নিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়।

যেভাবে নুসরাতকে হত্যা

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন।

এ ঘটনায় নুসরাতের পরিবার মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

কিন্তু মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় ৬ এপ্রিল ২০১৯ নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আগুনে মারাত্মকভাবে দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকায় নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল ২০১৯ তিনি মারা যান।

ভাইয়ের মামলায় বেরিয়ে আসে হত্যার ঘটনা

নুসরাতের মৃত্যুর পর তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। শুরুতে অগ্নিদগ্ধ করার ঘটনায় মামলা হলেও পরে নুসরাতের মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সহযোগিতা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে।

পরে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—

সিরাজ উদদৌলা, রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

হাইকোর্টে আসে ডেথ রেফারেন্স

বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে আইন অনুযায়ী তা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ কারণে নুসরাত হত্যা মামলার রায় ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর মামলার নথিপত্র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। পরে এটি ডেথ রেফারেন্স মামলা নম্বর ১৪০/২০১৯ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত মামলা হওয়ায় ডেথ রেফারেন্সের শুনানির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপার বুক প্রস্তুত করা হয়। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা নিজেদের সাজা বাতিল বা কমানোর আবেদন জানিয়ে পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেঞ্চ গঠন

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও সংশ্লিষ্ট মামলার শুনানি দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রধান বিচারপতি গত ১০ জুন নির্দিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করেন।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজাকে নিয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

এর ধারাবাহিকতায় নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মামলার পেপার বুক উপস্থাপনের মাধ্যমে শুনানি শুরু করে। পরে উভয় পক্ষ তাদের যুক্তি আদালতের সামনে তুলে ধরে।

আজ জানা যাবে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কি না

দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ হাইকোর্টের রায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে নুসরাতের পরিবার, আসামিপক্ষ এবং রাষ্ট্রপক্ষ।

হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন, কোনো আসামিকে খালাস দিতে পারেন, সাজা পরিবর্তন করতে পারেন কিংবা মামলার আইনগত ও প্রমাণগত বিষয় বিবেচনায় অন্য কোনো আদেশ দিতে পারেন।

তবে রায় ঘোষণার আগে আদালত কী সিদ্ধান্ত দেবেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর থেকে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে দেশজুড়ে। পাঁচ বছরের বেশি সময় পর মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে আজকের রায়কে এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!