ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

বৃষ্টিতে ভেঙে পড়া পাহাড়ি স্কুলে ফের শিক্ষার আলো, ১০ লাখ টাকায় হচ্ছে নতুন ভবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

বৃষ্টিতে ভেঙে পড়া পাহাড়ি স্কুলে ফের শিক্ষার আলো, ১০ লাখ টাকায় হচ্ছে নতুন ভবন

ছবিঃ সংগৃহীত

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভারী বর্ষণে ধসে পড়া একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাকহ্লানপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হোস্টেল পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে দীর্ঘদিন পর আবারও বিদ্যালয়টিতে শ্রেণি কার্যক্রম চালুর সুযোগ তৈরি হবে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকার চারটি গ্রামের শিশুদের শিক্ষার অন্যতম ভরসাস্থল এই বিদ্যালয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন দুজন। স্থানীয়ভাবে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও ছিল।

টানা বৃষ্টিতে ভেঙে পড়ে স্কুল ভবন

জানা গেছে, গত জুলাইয়ের প্রথম দিকে আলীকদমসহ পার্বত্য এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এতে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির প্রভাবে সাকহ্লানপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একপর্যায়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

ভবনটি বিধ্বস্ত হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম। দুর্গম এলাকায় বিকল্প কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন অভিভাবকরাও।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বিষয়টি অবহিত

বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জানান, ভবনটি ধসে পড়ার বিষয়টি আলীকদম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও কলেজ শিক্ষক মো. নূরুল ছাফার নজরে আসে। পরে তিনি মুঠোফোনে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহকে অবহিত করেন।

এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়টি দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় বান্দরবান জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়।

পরে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলমের তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয় ও হোস্টেল পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

১০ লাখ টাকায় নতুন ভবন ও হোস্টেল

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যালয় ও হোস্টেল পুনর্নির্মাণে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। গত ২৩ জুলাই নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কাজের প্রায় ২০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যালয় ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের।

‘স্কুলটি ছিল একমাত্র আশার জায়গা’

নয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা চাই হ্লা মং মারমা বলেন, দুর্গম এলাকায় স্কুল ভবনটি বৃষ্টিতে ভেঙে যাওয়ার পর ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে স্কুলঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় তারা স্বস্তি পেয়েছেন।

পাড়া কারবারি (পাহাড়ি গ্রামপ্রধান) দমলয় মুরুং বলেন, ওই এলাকায় চারটি গ্রামের মানুষ বসবাস করেন। শিশুদের পড়াশোনার জন্য বিদ্যালয়টি ছিল একমাত্র আশার জায়গা। তিনি বলেন, ‘স্কুলটি আবার গড়ে উঠছে—এটা আমাদের জন্য শুধু একটি ভবন নয়, আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন ফিরে পাওয়ার মতো।’

‘একটি স্কুল পুনর্নির্মাণ মানে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষা’

আলীকদম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও কলেজ শিক্ষক মো. নূরুল ছাফা বলেন, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য ছিল। তাঁর ভাষায়, একটি স্কুল পুনর্নির্মাণ শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়; এর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।

তিনি বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

দ্রুত পাঠদানের পরিবেশ ফেরানোর লক্ষ্য

আলীকদম উপজেলার সমাজকর্মী ইসমাইল হাসান বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনা এমনিতেই নানা চ্যালেঞ্জের। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো ভবন ধসে পড়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। দ্রুত পুনর্নির্মাণ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গর্ডেন ত্রিপুরা বলেন, প্রবল বৃষ্টিতে বিদ্যালয়টি ভেঙে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আনন্দিত।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মতভাবে নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রশাসনের লক্ষ্য।

নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবারও শুরু হবে পাঠদান। শিশুদের কোলাহলে মুখর হবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ—প্রাকৃতিক দুর্যোগে থমকে যাওয়া শিক্ষার কার্যক্রম ফিরে পাবে নতুন গতি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!