জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনেও থেমে থাকেনি দায়িত্ব। বিকেলে বাবার দাফন সম্পন্ন করে রাতে ফিরতে হয়েছে এটিএম বুথের চাকরিতে। চোখে বাবাকে হারানোর অশ্রু, বুকভরা শোক নিয়েই রাতভর দায়িত্ব পালন। আর পরদিন সকালেই বসতে হবে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায়। জীবনের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে এমন লড়াই করে চলা বাগেরহাটের এক তরুণ শিক্ষার্থী ইকনের গল্প এখন অনেককেই আবেগাপ্লুত করছে।
বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা ইকন চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের শিফটে খণ্ডকালীন চাকরি করেন।
হঠাৎ বাবার মৃত্যু, ভেঙে পড়ল পরিবারের শেষ অবলম্বন
মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ইকনের বাবা, ৪৫ বছর বয়সী ইসরাফিলাড়িয়া। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ইসরাফিল মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে কোনোমতে চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু পরিবারের সেই প্রধান উপার্জনকারী মানুষটির আকস্মিক মৃত্যু মুহূর্তেই পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে মরদেহ গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
বড় ভাই অসুস্থ, সংসারের পুরো দায়িত্ব ছোট ছেলের কাঁধে
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইকনের বড় ভাই ইমন একসময় বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে ছোট ছেলে ইকনের কাঁধে।
নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংসারের খরচ জোগাতে তিনি রাতের বেলা এটিএম বুথে চাকরি শুরু করেন। সেই আয়ে কোনোমতে চলছিল সংসার।
দাফনের পরই কর্মস্থলে, পরদিন এইচএসসি পরীক্ষা
বাবার দাফন শেষে অনেকেই যখন শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, তখন ইকনকে ফিরতে হয়েছে কর্মস্থলে। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকেও তাকে কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
কারণ, চাকরিতে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ নেই। অন্যদিকে বুধবার (২৩ জুলাই) সকালে রয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের পরীক্ষা।
একদিকে বাবাকে হারানোর গভীর শোক, অন্যদিকে সংসারের দায়ভার এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই—সবকিছু একসঙ্গে বয়ে নিয়েই পরীক্ষার হলে বসতে হচ্ছে এই তরুণকে।
সংগ্রামের গল্পে আবেগাপ্লুত স্থানীয়রা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইকন সবসময়ই পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। সংসারের প্রয়োজনে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করেও তিনি কখনও শিক্ষাজীবন থেকে সরে যাননি।
বাবার মৃত্যুর পরও দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে না গিয়ে কর্মস্থলে যোগ দেওয়া এবং পরদিন পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ঘটনাকে অনেকেই অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "এত বড় শোকের মধ্যেও ছেলেটি ভেঙে পড়েনি। সংসারের দায়িত্ব আর নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে আবার কাজে ফিরেছে। তার এই সংগ্রাম সত্যিই হৃদয়স্পর্শী।"
সংগ্রাম থেমে নেই
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই এমন নীরব সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। পরিবারের দায়িত্ব, জীবিকার চাপ এবং শিক্ষাজীবন—সবকিছুর ভার একসঙ্গে বহন করেও তারা স্বপ্ন দেখেন উচ্চশিক্ষা ও একটি সুন্দর ভবিষ্যতের।
ইকনের গল্প সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দায়িত্ববোধেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বাবাকে হারানোর শোক হয়তো কোনোদিন মুছে যাবে না, কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে নিজের স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটতে চান তিনি।

