এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এবার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডসহ মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন। একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ থাকায় মোট আবেদনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে ১৩ লাখে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুনর্নিরীক্ষণের জন্য লিখিত পরীক্ষার ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি উত্তরপত্রের আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ একজন পরীক্ষার্থী একাধিক বিষয়ে আবেদন করায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং মোট উত্তরপত্রের আবেদনের সংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হবে পুনর্নিরীক্ষণের ফল
শিক্ষা বোর্ডের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশের কথা রয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, বিপুলসংখ্যক আবেদন থাকলেও নির্ধারিত সময়েই ফল প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের জন্য তাদের লক্ষ্য ১০ সেপ্টেম্বর। আশা করা হচ্ছে, ওই দিনই শিক্ষার্থীরা ফল জানতে পারবেন। কোনো কারণে ফল প্রকাশে বিলম্ব হলে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদনের সময়ও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো হবে।
৪ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর আবেদন
এর আগে ১১ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন শুরু হয়। আবেদন গ্রহণের শেষ সময় ছিল ১৭ আগস্ট রাত পর্যন্ত।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। তাদের আবেদনের আওতায় রয়েছে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষার প্রায় ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র।
এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন হয়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি। অন্যদিকে ব্যবহারিক পরীক্ষার উত্তরপত্রের জন্য আবেদন পড়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি।
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনকারী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র যাচাইয়ের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে মোট পরীক্ষার্থীর তুলনায় উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের সংখ্যা অনেক বেশি।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন
বোর্ডভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন পড়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডে ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থী লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষার বিভিন্ন বিষয়ের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন।
ঢাকা বোর্ডে লিখিত পরীক্ষার ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ৫৮ হাজার ১২টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে।
অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন। এর মধ্যে—
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ৩৫ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী;
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ৩৯ হাজারের বেশি;
যশোর শিক্ষা বোর্ডে ২৮ হাজারের বেশি;
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ৩৯ হাজারের বেশি;
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ১৭ হাজারের বেশি;
সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজারের বেশি;
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ৩৭ হাজারের বেশি;
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ২৭ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন।
এ ছাড়া মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪০ হাজারের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন।
কেন ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন শিক্ষার্থীরা?
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, কোনো বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর নিয়ে সন্দেহ থাকা কিংবা কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন।
তবে ফল পুনর্নিরীক্ষণ মানেই নতুন করে পুরো উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা নয়। সাধারণত নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উত্তরপত্রের নম্বর গণনা, কোনো প্রশ্নের নম্বর বাদ পড়েছে কি না, নম্বর সঠিকভাবে স্থানান্তর হয়েছে কি না এবং অন্যান্য নির্ধারিত বিষয় যাচাই করা হয়।
পুনর্নিরীক্ষণের পর কারও ফল বা গ্রেড পরিবর্তিত হতে পারে। আবার অনেকের ফল অপরিবর্তিতও থাকতে পারে।
ফল পরিবর্তনের অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা
এবার বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করায় তাদের মধ্যে ফল পরিবর্তনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির বিষয়টি সামনে থাকায় পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের সময় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি।
শিক্ষা বোর্ডগুলো বলছে, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই ও প্রক্রিয়াকরণ শেষে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাদের সংশোধিত ফলাফল জানতে পারবেন।
একাদশে ভর্তিতেও প্রভাব পড়তে পারে
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করে। ফলে পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশে কোনো ধরনের বিলম্ব হলে ভর্তির সময়সূচির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, কোনো কারণে পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশে বিলম্ব হলে শিক্ষার্থীদের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে।
এ কারণে শিক্ষার্থীদের অযথা উদ্বিগ্ন না হয়ে শিক্ষা বোর্ডের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফল কবে জানা যাবে?
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের ফল আগামী ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়েই ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।
ফল প্রকাশের পর যেসব শিক্ষার্থীর নম্বর বা গ্রেড পরিবর্তন হবে, তাদের সংশোধিত ফলাফল শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
সার্বিকভাবে, প্রায় পৌনে ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন এবং ৪ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়াকে বেশ বড় পরিসরে নিয়ে গেছে। এখন আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা ১০ সেপ্টেম্বরের ফলাফলের জন্য।

