ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

চট্টগ্রাম কাস্টমসে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র মামলা নিয়ে হয়রানির অভিযোগ, তদন্তে এনবিআর

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

চট্টগ্রাম কাস্টমসে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র মামলা নিয়ে হয়রানির অভিযোগ, তদন্তে এনবিআর

ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে নানা অজুহাতে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পণ্যের সামান্য ভুলত্রুটি বা ঘোষণার সঙ্গে অসামঞ্জস্য পেলেই এইচএস (Harmonized System) কোড পরিবর্তনের অজুহাতে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র মামলা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। এতে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আমদানিকারকদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কিছু কর্মকর্তা পণ্যের শুল্কায়ন ও খালাস প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলেন। কোনো চালানে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে সামান্য পার্থক্য ধরা পড়লেই সেটিকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে দেখিয়ে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র মামলা করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে আমদানিকারকদের একদিকে যেমন পণ্য বন্দরে আটকে থাকার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘ সময় ধরে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে।

সামান্য অসঙ্গতিতেই এইচএস কোড পরিবর্তনের অভিযোগ | দুই আমদানিকারকের অভিযোগের পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি | ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন

অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের দুই কর্মকর্তার প্রশ্রয় ও নীরব সমর্থনেই একটি অসাধু চক্র এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

দুই আমদানিকারকের অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে এনবিআর

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘নতুন ইরা সু কোম্পানি’ ও ‘মালা এন্টারপ্রাইজ’-এর পণ্য চালান খালাস নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট চালানগুলো খালাসে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। এতে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান দুটি হয়রানি ও পণ্য খালাসে বিলম্বের অভিযোগ জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে আবেদন করে।

অভিযোগটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছানোর পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এনবিআর। পণ্য খালাসে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের দায়িত্বহীনতা বা ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল কি না এবং এর সঙ্গে রাজস্ব ক্ষতি বা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়ম জড়িত কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তিন সদস্যের শক্তিশালী তদন্ত কমিটি

অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এনবিআর। কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মো. জাকির হোসেন, কমিশনার, চট্টগ্রাম বন্ড। সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। কমিটির সদস্য মো. গিয়াস কামাল, কমিশনার, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিশনারেট।

কমিটি অভিযোগের নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট আমদানি চালান, কাস্টমস ঘোষণাপত্র, এইচএস কোড, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া এবং পণ্য খালাসে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ পর্যালোচনা করতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমদানিকারকদের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণও যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এইচএস কোড নিয়ে জটিলতাই কি হয়রানির হাতিয়ার?

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে এইচএস কোড নির্ধারণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই কোড গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে কাস্টমস ও আমদানিকারকের মধ্যে মতপার্থক্য হলে শুল্কের পরিমাণেও পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে এই পার্থক্যকে স্বাভাবিক শুল্কায়ন-সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে নিষ্পত্তি না করে ‘মিথ্যা ঘোষণা’ হিসেবে মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে আমদানিকারকের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং পণ্য খালাস আরও জটিল হয়ে পড়ে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো পণ্যের ঘোষিত এইচএস কোড নিয়ে আপত্তি থাকলে নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে মামলা ও পণ্য আটকে রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

বাড়ছে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে কাস্টমস হাউসে একটি চালান অযথা আটকে গেলে এর প্রভাব শুধু আমদানিকারকের ওপরই পড়ে না; পরিবহন, গুদাম, উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্য আটকে থাকার কারণে বন্দরের বিভিন্ন ধরনের চার্জ, গুদাম ভাড়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার কাঁচামাল বা প্রয়োজনীয় পণ্য সময়মতো খালাস না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

তাদের ভাষ্য, কাস্টমসের দায়িত্ব রাজস্ব সুরক্ষা ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু আইন প্রয়োগের নামে যদি অযথা হয়রানি বা ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে, তাহলে তা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তদন্তেই মিলবে অভিযোগের সত্যতা

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের দাবি, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এ ধরনের হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে অভিযোগগুলো কার্যকরভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির কম। এবার এনবিআরের সরাসরি তদন্ত উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তারা চান, তদন্ত কমিটি শুধু দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব, এইচএস কোড পরিবর্তন, ‘মিথ্যা ঘোষণা’র মামলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করুক। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই প্রকৃত ঘটনা ও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!