ঢাকা কাস্টমস হাউসের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটের ডেলিভারি গেট-১ ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে আমদানি নিষিদ্ধ, শর্তযুক্ত ও উচ্চ শুল্কের পণ্য খালাসের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মাজেদ ও এনামুলসহ সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
গত ১৭ আগস্ট আরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী এ অভিযোগ করেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে কমার্শিয়াল পণ্য চালানের আড়ালে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের এলসিডি, ইলেকট্রিক সিগারেট, পুরোনো ল্যাপটপ, মেডিসিন, ড্রোন, ওয়াকিটকি, সানগ্লাসসহ বিভিন্ন পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় খালাস দেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও এআরও মাজেদ ও এনামুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
‘প্রতিদিন হাজার হাজার মোবাইল খালাস’
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঢাকা কাস্টমস হাউসের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটের ডেলিভারি গেট-১ বর্তমানে একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চীন, হংকং, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা কমার্শিয়াল পণ্য চালানের আড়ালে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মোবাইল ফোন শুল্ক-কর পরিশোধ ও আমদানি শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালন ছাড়াই খালাসের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব মোবাইল ফোনের বিপরীতে সরকারের প্রাপ্য শুল্ক-কর বাবদ প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ থাকলেও তা ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, এর পাশাপাশি আমদানি নিষিদ্ধ ইলেকট্রিক সিগারেট, সেক্স টয়, পুরোনো ল্যাপটপ এবং আমদানি শর্তযুক্ত মেডিসিন, ড্রোন ও ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন পণ্যও একই কৌশলে খালাস করা হচ্ছে।
‘বৈধ আমদানিকারকরা পড়ছেন বিপাকে’
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, এ ধরনের অবৈধভাবে পণ্য খালাসের কারণে বৈধ আমদানিকারকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নিয়ম মেনে পণ্য আমদানি করে শুল্ক-কর পরিশোধকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অবৈধভাবে কম খরচে পণ্য বাজারজাতকারীদের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও মোবাইল ফোনের এলসিডি আমদানির ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি পড়ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগেও ঢাকা কাস্টমস হাউসের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটের ডেলিভারি গেট-১ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ১২টি মোবাইল ফোন এলসিডির চালান বৈধভাবে খালাস হতো। এসব চালান থেকে প্রতি সপ্তাহে বিপুল অঙ্কের শুল্ক-কর সরকারি কোষাগারে জমা পড়ত।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বর্তমানে বৈধভাবে এসব পণ্য আমদানির পরিবর্তে একটি চক্র চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা আমদানিকারকেরা বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
‘ফাঁকির টাকার ৬০ শতাংশ কমিশন’—অভিযোগ
অভিযোগপত্রের সবচেয়ে গুরুতর দাবিগুলোর একটি হলো, চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা কথিতভাবে ফাঁকি দেওয়া রাজস্বের একটি অংশ কমিশন হিসেবে গ্রহণ করছেন।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট চক্রটি মোট রাজস্ব ফাঁকির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন হিসেবে কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেয়।
এমনকি এই অর্থের একটি অংশ ঢাকা কাস্টমসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ইউনিটের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে অভিযোগের সঙ্গে কোনো আদালতের রায়, তদন্ত প্রতিবেদন বা স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মাজেদ-এনামুলকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে ঢাকা কাস্টমস হাউসের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটের ডেলিভারি গেট-১-এর কার্যক্রমের সঙ্গে এআরও মাজেদ ও এনামুলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাসের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কমার্শিয়াল পণ্য চালানের কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রকৃত পণ্যের তথ্য গোপন, ভুল ঘোষণা কিংবা আমদানি শর্ত এড়িয়ে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে কাস্টমসের স্বাভাবিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
ব্যাগেজ রুলসের সুযোগ নিয়ে চোরাচালানের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যাগেজ রুলসের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রবাসী যাত্রীরা নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক নতুন মোবাইল ফোন আনতে পারেন।
অভিযোগকারীর দাবি, দেশে মোবাইল ফোনের ব্যাপক চাহিদা এবং বৈধ আমদানিতে প্রযোজ্য শুল্ক-কর ও আমদানি শর্তের কারণে একটি চোরাচালান চক্র সক্রিয় হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এয়ার ফ্রেইট ইউনিটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মোবাইল ফোন খালাস করা হচ্ছে।
এতে বৈধ আমদানিকারকদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজস্ব ফাঁকি কতটা—তদন্তেই মিলবে উত্তর
অভিযোগে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব ক্ষতির দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোবাইল ফোন থেকেই প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রকৃতপক্ষে কত পরিমাণ পণ্য খালাস হয়েছে, কত শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব তথ্য নির্ধারণে চালানভিত্তিক নথি, বিল অব এন্ট্রি, পণ্য পরীক্ষা প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, ডেলিভারি রেকর্ড, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের তথ্য এবং ব্যাংক লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় কেবল প্রশাসনিক তদন্ত নয়, প্রয়োজন হলে পৃথকভাবে আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎসও খতিয়ে দেখা উচিত।
জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
অভিযোগকারী দুদক ও এনবিআরের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এয়ার ফ্রেইট ইউনিটের ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ চালানগুলোতে কঠোর নজরদারি এবং বৈধ আমদানিকারকদের জন্য সমান ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এআরও মাজেদ ও এনামুলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এখন প্রশ্ন হলো—দুদক ও এনবিআরের তদন্তে অভিযোগপত্রে ওঠা এসব দাবির কতটা সত্যতা মেলে এবং ঢাকা কাস্টমসের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটে সত্যিই কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পণ্য খালাস করছে কি না। নথিপত্র ও চালানভিত্তিক তদন্তেই তার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

