ঢাকা দক্ষিণ বন্ডেড কমিশনারেটের অধীন ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ঢাকা ইপিজেড)-এ কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা মাধব চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা, ঘুষ গ্রহণ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উল্লেখ করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস ও রাজস্ব বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে মাধব চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ইপিজেডে বিভিন্ন আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
কর নথিতে আয় ও সম্পদের হিসাব
রাজস্ব বোর্ডের ২০২৫-২৬ করবর্ষের আয়কর নথি পর্যালোচনার দাবি করে অভিযোগে বলা হয়েছে, মাধব চন্দ্র দাস তার বার্ষিক মোট আয় দেখিয়েছেন ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৬ টাকা। একই নথিতে তার নিট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৩২১ টাকা।
অভিযোগকারীর দাবি, নথিতে প্রদর্শিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে তার কথিত বাস্তব সম্পদ ও জীবনযাত্রার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে। এ কারণে আয়কর নথিতে সম্পদ ও ব্যয়ের তথ্য সঠিকভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
জমি-ফ্ল্যাট নিয়ে প্রশ্ন
কর নথিতে ভাটারায় ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা মূল্যের অকৃষি জমি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীর দাবি, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মাধব চন্দ্র দাস ও তার স্ত্রী পুনম রানী মহন্তের নামে ফ্ল্যাটসহ ভাটারায় আরও মূল্যবান সম্পদ রয়েছে।
এছাড়া তার নিজ জেলা হবিগঞ্জের বানিয়াচং এলাকায়ও নামে-বেনামে স্থাবর সম্পদ থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং আয়কর নথিতে সেগুলোর যথাযথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে দুদকের কাছে।
জীবনযাত্রা বনাম ঘোষিত ব্যয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার ঘোষিত আয়ের তুলনায় কথিত জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।
২০২৫-২৬ করবর্ষের নথিতে তার বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা। অভিযোগকারীর দাবি, রাজধানীতে বসবাস, ফ্ল্যাট, জমি, যানবাহন, পারিবারিক ব্যয়সহ তার কথিত জীবনযাত্রার সঙ্গে এই ব্যয়ের হিসাব সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ
মাধব চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ঢাকা ইপিজেডের বিভিন্ন আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে শুল্ক ও ভ্যাটসংক্রান্ত সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাস, মূল্যায়ন, শুল্ক-ভ্যাট নির্ধারণ কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, আমদানি-রপ্তানি তথ্য, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পদের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।
আগের কর্মস্থল নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগকারীর দাবি, অতীতে বিভিন্ন কাস্টমস সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালেও মাধব চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা এবং এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে অতীতের এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। দুদকের তদন্তেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
দুদকের তদন্ত দাবি
লিখিত অভিযোগে মাধব চন্দ্র দাসের ব্যাংক হিসাব, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, আয়কর নথি, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত ফাইল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার দাপ্তরিক লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং সম্পদ অর্জনে কোনো অবৈধ অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হোক।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা
উত্থাপিত অভিযোগ, আয়কর নথিতে প্রদর্শিত সম্পদ ও ব্যয়ের সঙ্গে কথিত বাস্তব সম্পদের অসঙ্গতি এবং শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজস্ব কর্মকর্তা মাধব চন্দ্র দাসের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তও এখন পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

