রপ্তানি না করেই কাগজপত্রে পণ্য রপ্তানি দেখানোর অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের চারটি পোশাক ও টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে কাস্টমসের তদন্তে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের রপ্তানি নথি যাচাই করতে গিয়ে দেশের সাতটি প্রতিষ্ঠানের ১২২টি চালানে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানির আর্থিক মূল্য অন্তত ২৪ কোটি টাকা বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জের চিহ্নিত চার প্রতিষ্ঠান হলো—ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার আরটি ফ্যাশন, এনএম ফ্যাশন, এনএম নিট ফ্যাশন এবং রূপগঞ্জের রূপসীর ভূঁইয়া ফেব্রিক্স। কাস্টমসের প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় রপ্তানি নথি তৈরি ও দাখিল করা হলেও সংশ্লিষ্ট চালানের পণ্য বাস্তবে বন্দরে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ পণ্য ছাড়াই কাগজে-কলমে রপ্তানি সম্পন্ন দেখানোর ঘটনা ঘটেছে।
কাগজে রপ্তানি, বন্দরে নেই পণ্য
রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সাধারণত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চালান, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্টসহ প্রয়োজনীয় নথি দাখিল করে। এরপর পণ্য বন্দরে প্রবেশ, যাচাই ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রপ্তানি প্রক্রিয়া শেষ হয়। কিন্তু তদন্তে যেসব অসঙ্গতি পাওয়া গেছে, তাতে কিছু ক্ষেত্রে পণ্য বন্দরে না এলেও নথিপত্রের ভিত্তিতে চালান রপ্তানির জন্য প্রস্তুত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
আরটি ফ্যাশনের একটি চালানকে ঘিরে বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। নথি যাচাইয়ের সময় পণ্যের ওজন ও পুরো চালানের ওজন একই দেখানো হয়। সাধারণত প্যাকেজিং ও মোড়কের কারণে পণ্যের নিট ওজন এবং চালানের মোট ওজনের মধ্যে পার্থক্য থাকে। এই অস্বাভাবিকতাই কর্মকর্তাদের সন্দেহের কারণ হয়।
পরবর্তী যাচাইয়ে ওই চালানের পণ্য বন্দরে না থাকার তথ্য পাওয়া যায় বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমনকি চালানটি রপ্তানি হিসেবে দেখাতে জাল কাগজপত্র, স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তে এসেছে।
বন্ডেড সুবিধা কীভাবে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দিয়ে থাকে। এ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্তে রপ্তানির উদ্দেশ্যে কাঁচামাল শুল্ক-করমুক্ত বা বিশেষ সুবিধায় আমদানির সুযোগ পায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। শর্ত হলো—সেই কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য নির্ধারিত নিয়মে বিদেশে রপ্তানি করতে হবে।
কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কাগজে রপ্তানি দেখিয়ে বাস্তবে পণ্য রপ্তানি না করে, তাহলে বন্ডেড সুবিধার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, এ ধরনের কারসাজির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল এনে উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফলে সরকার একদিকে শুল্ক-কর থেকে রাজস্ব হারাতে পারে, অন্যদিকে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী রপ্তানিকারকদের সঙ্গে অসাধু প্রতিষ্ঠানের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি অর্থপাচারের ঝুঁকি
কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ভুয়া রপ্তানির বিষয়টি শুধু শুল্ক ফাঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে অর্থপাচার ও বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকিও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আমদানির সময় পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে বিদেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হতে পারে। পরে সেই অর্থের লেনদেনকে বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে দেখাতে ভুয়া রপ্তানি নথি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে বন্ডেড পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলে পণ্যভেদে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ও কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে এসব দায় এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি রপ্তানি প্রণোদনা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। ফলে একই ঘটনায় রাজস্ব ফাঁকি, বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের সম্ভাব্য ঝুঁকি—তিনটি দিকই সামনে এসেছে।
কাস্টমস ব্যবস্থার নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে রপ্তানি প্রক্রিয়ার তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে। কোনো পণ্য বন্দরে প্রবেশ না করেই যদি নথিপত্রের ভিত্তিতে রপ্তানি হিসেবে প্রক্রিয়াজাত হতে পারে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধাপগুলোতে নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, রপ্তানি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের দুর্বলতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জের চার প্রতিষ্ঠানের মালিকানা
তদন্তে নাম আসা আরটি ফ্যাশন, এনএম ফ্যাশন ও এনএম নিট ফ্যাশনের মালিক হিসেবে নজরুল ইসলামের নাম এসেছে। ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের মাসদাইর ও গাবতলী এলাকায় তার আরও পোশাক কারখানা রয়েছে।
অন্যদিকে রূপগঞ্জের রূপসীর খাদুন এলাকার ভূঁইয়া ফেব্রিক্সের মালিক মোস্তফা মনোয়ার ভূঁইয়া। তিনি নিট পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক পদেও ছিলেন।
আরটি ফ্যাশনের মালিক নজরুল ইসলাম ও তার ছেলে মো. সাকিবের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।
ভূঁইয়া ফেব্রিক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা মনোয়ার ভূঁইয়া জানান, কাস্টমসের পক্ষ থেকে তার কাছে কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল এবং তিনি সেগুলো যথাযথভাবে জমা দিয়েছেন। তবে রপ্তানি না করেই ভুয়া চালান দেখানোর অভিযোগ নিয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তদন্তেই মিলবে প্রকৃত চিত্র
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস আইসিডির কমিশনার আবুল বাশার মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, বছরের প্রথম ছয় মাসের রপ্তানি নথি যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে অনিয়মের প্রকৃত পরিমাণ ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তে শুধু সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক নয়, পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ—পণ্য বন্দরে প্রবেশের রেকর্ড, ওজন পরিমাপ, কনটেইনার মুভমেন্ট, গেটপাস, শিপিং নথি, ব্যাংক লেনদেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের হিসাব এবং রপ্তানি-পরবর্তী রেকর্ড—সমন্বিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি কেবল কয়েকটি ভুয়া রপ্তানি চালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব, বন্ডেড সুবিধার বিশ্বাসযোগ্যতা, রপ্তানি খাতের সুনাম এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িয়ে পড়বে।
এখন কাস্টমসের তদন্তেই নির্ধারিত হবে—২৪ কোটি টাকার এই ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানি কতটা বিস্তৃত, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর মাধ্যমে সরকারের প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত।

