ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক: টানাপোড়েনের আড়ালে কার লাভ?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক: টানাপোড়েনের আড়ালে কার লাভ?

ছবিঃ সংগৃহীত

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েন দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এরই মধ্যে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যদি দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি, অবিশ্বাস ও উত্তেজনার মধ্যে থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে কে?

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় (এফসিসি) শেখ হাসিনার একটি অডিও বক্তব্য প্রচারকে কেন্দ্র করে ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। বাংলাদেশ এ আয়োজনের নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করে।

তবে ভারত জানিয়েছে, ওই আয়োজনের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তাদের ভাষ্য, এফসিসি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে কী ধরনের অনুষ্ঠান হবে, সেটি সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়।

কূটনৈতিক ব্যাখ্যা যাই হোক, বাস্তবতা হলো—শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই জমে থাকা অস্বস্তি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ঘিরে সৃষ্ট বিরোধ কি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সামগ্রিক কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে দুই দেশ জটিল বিষয়গুলো আলাদা করে সমাধানের পথে এগোবে?

শেখ হাসিনা ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পুরো সম্পর্ক নয়

বাংলাদেশের জন্য শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া, বিভিন্ন মামলার কার্যক্রম এবং প্রত্যর্পণের বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আইনি কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তিও রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ বা তাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়াও জড়িত।

তবে একই সঙ্গে এটিও বাস্তবতা যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শেখ হাসিনার চেয়ে অনেক বড় এবং বহুমাত্রিক।

দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, যোগাযোগ, পরিবহন, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে উভয় দেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিতে।

অতএব, শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় থাকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এই একটি বিষয়কে দুই দেশের সব ধরনের সম্পর্কের একমাত্র নিয়ামক বানিয়ে ফেলাও দীর্ঘমেয়াদে কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।

গঙ্গা-তিস্তা থেকে সীমান্ত—অমীমাংসিত ইস্যু বহু

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি পানি বণ্টন। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে যেমন নিয়মিত পর্যালোচনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিনের তিস্তা সমস্যারও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সীমান্তে প্রাণহানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান, নদীর পানি, বাণিজ্য ঘাটতি, পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—এমন বহু বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে দুই দেশের নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন।

কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে এসব আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়। আর যোগাযোগ কমে গেলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, অনাস্থা তৈরি হয় এবং ছোট একটি সমস্যাও বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

সেই কারণে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও যোগাযোগের দরজা খোলা রাখা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।

দিল্লির আমন্ত্রণ, ঢাকার সামনে কূটনৈতিক পরীক্ষা

এদিকে ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করা হবে কি না—এটি এখন ঢাকার জন্য শুধু একটি সফরের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশলের প্রশ্নও জড়িত।

সফরে গেলে একদিকে যেমন রাজনৈতিক সমালোচনা তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে তা দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। আর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা হলে বিপরীত একটি বার্তা যেতে পারে—শেখ হাসিনা ইস্যুই হয়তো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের ওপর প্রাধান্য পাচ্ছে।

কূটনীতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত আবেগ দিয়ে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনা করেই নেওয়া হয়।

প্রত্যর্পণ ইস্যুতে স্পষ্টতা চায় ঢাকা

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। ঢাকা চায়, তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

ভারতের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এ বিষয়ে অনুরোধ পাওয়ার বিষয়টি তারা অবগত এবং নিজেদের আইনি কাঠামোর আওতায় বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।

তবে এ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ আরও বাড়তে পারে। ফলে প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারত যদি তার আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে, তাহলে দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশেরও উচিত বিষয়টিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বিদ্যমান চুক্তি, আন্তর্জাতিক রীতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া।

ভারতেও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন

শুধু বাংলাদেশেরই দায়িত্ব নয়; সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে এমন কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে, যা ঢাকার কাছে উসকানিমূলক বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী বলে মনে হতে পারে, তা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এক দেশের ভূখণ্ড অন্য দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হয়ে উঠলে পারস্পরিক আস্থার সংকট আরও গভীর হয়।

সম্পর্ক খারাপ হলে ক্ষতি হবে কার?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই—বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিন খারাপ থাকলে লাভবান হবে কে?

দুই দেশের ব্যবসায়ী, আমদানি-রপ্তানিকারক, বিনিয়োগকারী কিংবা সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ—কারও জন্যই এটি ভালো খবর নয়।

যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন। জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়তে পারে। পানি বণ্টন ও সীমান্ত সমস্যার মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান আরও কঠিন হতে পারে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস কোনো দেশের জন্যই ইতিবাচক নয়।

বরং এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারে দুই দেশের রাজনৈতিক কট্টরপন্থী ও বিভাজননির্ভর স্বার্থগোষ্ঠী, যারা পারস্পরিক অবিশ্বাস ও উত্তেজনাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে কৌশলগত সুবিধা নিতে চাওয়া বাইরের শক্তিগুলোর জন্যও এমন পরিস্থিতি সুযোগ তৈরি করতে পারে।

দরকার আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কূটনীতি

বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সম্পর্ক কোনোভাবেই জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে হওয়ার কথা নয়। একইভাবে ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার দাবি, সীমান্ত সমস্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য কিংবা নিরাপত্তা—প্রতিটি ইস্যুতেই বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অবস্থান স্পষ্ট রাখার অর্থ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া নয়।

বরং শক্তিশালী কূটনীতি হলো—নিজের স্বার্থে অটল থেকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর কিংবা ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগকে তাই শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরিবর্তে বাংলাদেশের বৃহত্তর কূটনৈতিক স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা ইস্যুর একটি আইনি ও কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন—এ নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও সচল রাখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক যদি স্থায়ীভাবে বৈরিতার দিকে চলে যায়, তাহলে লাভবান হবে কারা?

বাংলাদেশ নয়, ভারতও নয়। লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই, যারা দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিভাজন, অবিশ্বাস ও উত্তেজনা থেকে রাজনৈতিক কিংবা কৌশলগত সুবিধা নিতে চায়।

তাই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দৃঢ় অবস্থান, কার্যকর সংলাপ এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনই হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তবসম্মত পথ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!