ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

ঈশ্বরদীতে বিএনপির রাজনীতি, নাকি দুই ব্যবসায়িক বলয়ের আধিপত্যের লড়াই?

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

ঈশ্বরদীতে বিএনপির রাজনীতি, নাকি দুই ব্যবসায়িক বলয়ের আধিপত্যের লড়াই?

ছবিঃ সংগৃহীত

দল থাকলে দলের রাজনীতি থাকে; আর রাজনীতি থাকলে সেখানে রাজনৈতিক আদর্শ, মতাদর্শের চর্চা এবং স্বাভাবিকভাবেই আদর্শগত মতপার্থক্য বা অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রশ্নও আসে। কিন্তু কোনো দলের ন্যূনতম সাংগঠনিক কাঠামোই যদি কার্যকর না থাকে, তাহলে সেই দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রশ্নটি কতটা যৌক্তিক—সেটিই আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ঈশ্বরদীর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন উঠতেই পারে এবিষয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে দৈনিক আজ ও আগামীকাল-এর সম্পাদক মোঃ রাকিবুল ইসলাম

প্রশ্ন: ঈশ্বরদীতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করা দরকার। দল থাকলে দলের রাজনীতি থাকবে; আর রাজনীতি থাকলে সেখানে রাজনৈতিক আদর্শ, মতাদর্শের চর্চা এবং স্বাভাবিকভাবেই আদর্শগত মতপার্থক্য বা অন্তর্দ্বন্দ্বও থাকবে। কিন্তু কোনো দলের ন্যূনতম সাংগঠনিক কাঠামোই যদি কার্যকর না থাকে, তাহলে সেই দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রশ্নটি কতটা যৌক্তিক—সেটি আগে দেখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: তাহলে ঈশ্বরদীতে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: ঈশ্বরদীর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—এখানে আদৌ বিএনপির একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে কি না। একটি রাজনৈতিক দলের কমিটি, সাংগঠনিক কার্যক্রম, নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চার দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। এসব বিষয় যদি বাস্তবে দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে ঈশ্বরদীতে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে যে বিভাজন বা দ্বন্দ্বের কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে নিছক দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা আছে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

প্রশ্ন: আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টির পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ কাজ করতে পারে?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: অবশ্যই সেই সম্ভাবনাটি অনুসন্ধানের দাবি রাখে। ঈশ্বরদীতে বিএনপির নাম ও পরিচয়কে ঘিরে যে বিভাজন, উত্তেজনা কিংবা আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তার নেপথ্যে আদর্শিক রাজনীতির চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বেশি কার্যকর কি না—এমন অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তবে এটি অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে; সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তথ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রয়োজন।

প্রশ্ন: স্থানীয়ভাবে দুই ধরনের প্রভাবশালী বলয়ের কথা শোনা যায়। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় একদিকে ‘হাবিব অ্যান্ড কোম্পানি’, অন্যদিকে ‘পিন্টু অ্যান্ড ব্রাদার্স’—এমন দুটি বলয়ের প্রভাব বিস্তারের কথা বলা হয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এই দুই বা একাধিক বলয়ের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পর্ক কী? যদি রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যবসায়িক বলয়ের শক্তি বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি নিছক দলীয় রাজনীতি নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুসন্ধানের বিষয়।

প্রশ্ন: যারা নিজেদের বিএনপির নেতা-কর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও কি প্রশ্ন আছে?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: অবশ্যই প্রশ্ন থাকতে পারে। তারা কি সত্যিই একটি সাংগঠনিক রাজনৈতিক কাঠামোর কর্মী, নাকি নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসায়িক বা প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি—এটি যাচাই করা জরুরি। একজন রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় তার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থান, দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং আদর্শগত ভূমিকার মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা।

প্রশ্ন: দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বা সংঘাতকে তাহলে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: সেটিকে শুধু ‘বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ বলে ব্যাখ্যা করলে হয়তো পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে রাজনৈতিক আদর্শের লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়িক আধিপত্য, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের বলয় শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতা কাজ করছে কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: তৃতীয় কোনো পক্ষ এই দ্বন্দ্ব থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন সম্ভাবনাও কি আপনি দেখছেন?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটি নতুন শক্তি বা স্বার্থগোষ্ঠী যদি নিজেদের ব্যবসায়িক অবস্থানকে শক্তিশালী করে একটি প্রভাবশালী কর্পোরেট বলয়ে রূপ দিতে চায়, তাহলে বিদ্যমান দুই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের সংঘাত যত তীব্র হয়, তৃতীয় পক্ষের জন্য প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সুযোগ তত বাড়তে পারে।

প্রশ্ন: এ ক্ষেত্রে প্রচলিত একটি প্রবাদও প্রাসঙ্গিক হতে পারে কি?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: অবশ্যই। সমাজে একটি প্রচলিত কথা আছে—নিজের প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে কেউ যখন বাইরের শক্তির সহায়তা নেয়, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই তার জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও এমন ঘটনা নতুন নয়। তাই সাময়িক স্বার্থে কোনো পক্ষ যদি অন্য কোনো শক্তিকে ব্যবহার করে, ভবিষ্যতে সেই সম্পর্ক কী ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

প্রশ্ন: তাহলে আপনার দৃষ্টিতে ঈশ্বরদীর বর্তমান পরিস্থিতির মূল প্রশ্নটি কী?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: মূল প্রশ্নটি খুব পরিষ্কার—এটি কি সত্যিই রাজনৈতিক আদর্শ, সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও নীতিগত অবস্থানের দ্বন্দ্ব, নাকি বিএনপির নাম ও পরিচয়কে ব্যবহার করে প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা?

প্রশ্ন: এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে পাওয়া সম্ভব?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে। ঈশ্বরদীতে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো কী অবস্থায় আছে, কারা নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, দলীয় কর্মসূচিতে কারা সক্রিয়, বিভিন্ন সংঘাতের সঙ্গে কারা জড়িত বা কারা লাভবান হচ্ছেন, ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয় নথি, প্রত্যক্ষ তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।

প্রশ্ন: শেষ পর্যন্ত আপনি ঈশ্বরদীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কী বলতে চান?

মোঃ রাকিবুল ইসলাম: কোনো একটি পক্ষের বক্তব্য শুনে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ভিত্তিতে ঈশ্বরদীর রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচার করা ঠিক হবে না। ‘বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল’—এই একটি শব্দের আড়ালে যদি আরও বড় কোনো স্বার্থ, প্রভাব বিস্তার বা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থেকে থাকে, তাহলে সেটি অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত। আবার অভিযোগের বিপরীতে যদি বাস্তব সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি থাকে, সেটিও তথ্য-প্রমাণসহ স্পষ্ট হওয়া দরকার।

আমার মনে হয়, ঈশ্বরদীর রাজনীতিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধের চশমায় না দেখে সাংগঠনিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক আদর্শ, নেতৃত্বের ভূমিকা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং প্রভাব বিস্তারের সম্পর্ক—এই পাঁচটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাহলেই বোঝা যাবে, এটি প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়কে ঘিরে অন্য কোনো স্বার্থের প্রতিযোগিতা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!