যশোরের কেশবপুরে সরকারি উদ্যোগে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মাসিক সম্মানীর তালিকা তৈরিকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে পাঁজিয়া ইউনিয়নের গড়ভাঙ্গা বায়তুন নুর জামে মসজিদ। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রকৃত ইমাম ও খাদেমকে বাদ দিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাদের নাম ইমাম ও খাদেম হিসেবে তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মুসল্লিরা সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত ওই মসজিদটিকেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানা গেছে।
সরকারি সম্মানী, কিন্তু তালিকায় ‘কারা’?
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মাসিক সম্মানী দেওয়ার জন্য তালিকা তৈরির কাজ চলছে। নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী ইমামের জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং খাদেমের জন্য ২ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়ার কথা রয়েছে। কেশবপুরে প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ১৫টি করে মসজিদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কিন্তু সরকারি অর্থ পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা সেই তালিকাই এখন প্রশ্নের মুখে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত দায়িত্বশীলদের যাচাই না করে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে কোথাও কোথাও নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গড়ভাঙ্গা বায়তুন নুর মসজিদে বদলে গেল নাম
স্থানীয় মুসল্লি ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গড়ভাঙ্গা বায়তুন নুর জামে মসজিদে দীর্ঘদিন ধরে ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা আব্দুর রহমান এবং খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল রাজ্জাক।
কিন্তু সম্মানীর তালিকা তৈরির সময় তাঁদের নাম বাদ দিয়ে মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার ও স্থানীয় জামায়াত নেতা তবিবুর রহমানকে ‘ইমাম’ এবং গড়ভাঙ্গা ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি আব্দুল মুতালেব মোল্লাকে ‘খাদেম’ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
অর্থাৎ, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মসজিদে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম কীভাবে সরকারি সম্মানীর তালিকায় গেল—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
মসজিদ কমিটির সভাপতির বক্তব্যে আরও প্রশ্ন
মসজিদ কমিটির সভাপতি ইসলাম সরদার জানিয়েছেন, তালিকা তৈরির বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়নি এবং তাঁর মতামতও নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, স্থানীয় জামায়াত নেতারা নিজেদের মতো করে তালিকা তৈরি করেছেন এবং প্রকৃত ইমাম ও খাদেমের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
তবে অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছেন পাঁজিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মাসুদ কামাল। তাঁর বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়; মসজিদ কমিটি যে তালিকা দিয়েছে, সেটিই তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছেন।
এখানেই তৈরি হয়েছে অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন—তালিকা যদি মসজিদ কমিটি দিয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃত ইমাম ও খাদেমের নাম বাদ পড়ল কীভাবে? আর তালিকাটি যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কী ধরনের যাচাই করেছিলেন?
তদন্তের নির্দেশ, তারপরও প্রশ্ন
অভিযোগটি সামনে আসার পর স্থানীয়দের পক্ষ থেকে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোক্তার আলী জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত না হলে মসজিদ পরিবর্তন করে দেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেশবপুরে ইউনিয়নপ্রতি ১৫টি মসজিদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং তালিকার একটি অংশ সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত অভিযোগের পর গড়ভাঙ্গা বায়তুন নুর জামে মসজিদকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
শুধু একটি মসজিদ নয়—বৃহত্তর অনিয়মের অভিযোগ
ঘটনাটি কেবল গড়ভাঙ্গা বায়তুন নুর মসজিদে সীমাবদ্ধ কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেশবপুরের বিভিন্ন মসজিদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও প্রকৃত ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কোথাও প্রকৃত ইমামের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম, আবার কোথাও পৃথক খাদেম না থাকলেও নতুন করে খাদেমের নাম যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তালিকা তৈরিতে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করার অভিযোগও এসেছে।
যদিও এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে পুরো তালিকা, মসজিদ কমিটির অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া কাগজপত্র এবং প্রকৃত দায়িত্বশীলদের তথ্য যাচাই করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি অর্থ, তাই জবাবদিহিও জরুরি
একজন ইমামের নামে মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনের নামে ৩ হাজার টাকা এবং খাদেমের নামে ২ হাজার টাকা—অঙ্কটি ব্যক্তিগতভাবে খুব বড় না হলেও সরকারি অর্থ হিসেবে এর প্রতিটি টাকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
কারও রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় পদ বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে প্রকৃত ইমাম-খাদেম বাদ পড়ে থাকলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রাপ্য সম্মানী থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় নয়; বরং সরকারি অর্থ বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন।
তাই কেশবপুরের প্রতিটি তালিকা প্রকাশ্যে যাচাই, মসজিদ কমিটির লিখিত অনুমোদন গ্রহণ, প্রকৃত ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমের দায়িত্ব পালনের প্রমাণ যাচাই এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্ত—এসব নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুসন্ধানের কেন্দ্রে এখন কয়েকটি প্রশ্ন
১. প্রকৃত ইমাম ও খাদেমের নাম বাদ দিয়ে অন্যদের নাম তালিকায় ঢুকল কীভাবে?
২. তালিকা তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির সভাপতি ও মুসল্লিদের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি?
৩. সরকারি সম্মানীর তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কী ধরনের যাচাই করেছেন?
৪. রাজনৈতিক পরিচয় কি তালিকা তৈরিতে কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছে?
৫. একই ধরনের অভিযোগ অন্য মসজিদগুলোতেও আছে কি না, তা কি প্রশাসন যাচাই করবে?
৬. অভিযোগের পর মসজিদটিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলেও প্রকৃত ইমাম ও খাদেমের অধিকার পুনর্বহাল হবে কীভাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল গড়ভাঙ্গা বায়তুন নুর জামে মসজিদের জন্য নয়; সরকারি সম্মানীর পুরো তালিকা কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রকৃত উপকারভোগীভিত্তিক—তারও পরীক্ষা।

