ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

দিল্লির রাজপথে জেন-জি, বাড়ছে সরকারবিরোধী চাপ

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

দিল্লির রাজপথে জেন-জি, বাড়ছে সরকারবিরোধী চাপ

ছবিঃ সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত চার বছরে একের পর এক গণআন্দোলন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৫ সালে নেপালের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ—এই ধারাবাহিকতায় এবার আলোচনায় ভারতের রাজধানী দিল্লি। একটি জাতীয় পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোকে কেবল শিক্ষার্থী বা তরুণদের ক্ষোভ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া—এই কয়েকটি সাধারণ উপাদান প্রায় সব আন্দোলনের পেছনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শিক্ষা শেষ, চাকরি নেই—তরুণদের হতাশা বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার আন্দোলনের অন্যতম বড় কারণ হলো উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব।

ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করলেও তাদের মধ্যে মাত্র ২৮ লাখের মতো কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারদের মধ্যে গ্র্যাজুয়েটদের হার ২০১৭ সালের ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে প্রায় ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

এই বাস্তবতায় জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রায় ২২ লাখ ৭০ হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়।

সূত্রগুলো বলছে, গত পাঁচ বছরে ভারতের ১৬টি রাজ্যে অন্তত ৪৮টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় দেড় কোটি চাকরিপ্রার্থীর ওপর। যদিও ২০২৪ সালে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন করা হয়েছিল, তবুও পরবর্তী বছরগুলোতেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

বৈষম্যের বাস্তবতা আরও দৃশ্যমান

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে বৈষম্য এখন প্রতিদিন মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

একদিকে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছেন বা চাকরি পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের বিলাসী জীবনযাপন সহজেই তার সামনে চলে আসছে। এতে হতাশা আরও গভীর হচ্ছে।

নেপালের আন্দোলনে ‍‍`নেপো কিডস‍‍` শব্দটি যেমন স্বজনপ্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি ভারতেও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ বাড়ছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমছে

বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন মানুষ মনে করে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায় না, আদালতের সিদ্ধান্ত দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায় এবং নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা ক্ষীণ হয়ে পড়ে, তখন আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়ে।

দিল্লির চলমান আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া, কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়া এবং পরে পুলিশের লাঠিচার্জ ও ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার অভিযোগ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ক্ষোভ যখন অপমানবোধে রূপ নেয়

গবেষকরা মনে করেন, আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো—রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য বা আচরণ যখন আন্দোলনকারীদের কাছে অপমানজনক বলে প্রতীয়মান হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি গণআন্দোলনে দেখা গেছে, ছোট একটি ইস্যু ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালের অভিজ্ঞতায় এমন প্রবণতা দেখা গেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা কী বলছে?

পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখায় যে, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, দুর্নীতি, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একসঙ্গে জমতে জমতে একটি পর্যায়ে বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে।

তবে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। তাই একটি দেশের অভিজ্ঞতা সরাসরি অন্য দেশের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবুও শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!