ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বিমানবন্দরে সিআইআইডির অভিযান: তিন সপ্তাহে ১৫ কোটির বেশি টাকার পণ্য জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

বিমানবন্দরে সিআইআইডির অভিযান: তিন সপ্তাহে ১৫ কোটির বেশি টাকার পণ্য জব্দ

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস স্টেশনে চোরাচালান এবং শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে তৎপরতা বাড়িয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। যাত্রী প্রোফাইলিং, গোপন গোয়েন্দা তথ্য, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি এবং শিফটভিত্তিক তল্লাশির মাধ্যমে আগস্টের প্রথম তিন সপ্তাহে একের পর এক অভিযান চালানো হয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বেনাপোল সীমান্তসহ বিভিন্ন কাস্টমস স্টেশনে পরিচালিত এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ সোনা, বিদেশি সিগারেট, আইফোন, নিষিদ্ধ প্রসাধনী, মদ, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য জব্দ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম তিন সপ্তাহে এসব অভিযানে জব্দ পণ্যের মূল্য ১৫ কোটিরও বেশি টাকা।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, চোরাচালানকারীরা সোনা ও মূল্যবান পণ্য পাচারে প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। কখনো অন্তর্বাসে, কখনো ট্রলির গোপন চেম্বারে, আবার কখনো লাগেজের ভেতরের বিশেষ স্থানে পণ্য লুকিয়ে আনা হচ্ছে। তবে গোয়েন্দা তথ্য ও নিবিড় নজরদারির কারণে এসব কৌশলও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ছে।

অন্তর্বাসে সোনা, ট্রলিতে গোপন চেম্বার

গত ১৭ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাইফেরত এক যাত্রীর কাছ থেকে ৮৮১ গ্রাম সোনা পেস্ট জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দারা।

এর আগে ৩ আগস্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতীয় ও বাংলাদেশি দুই যাত্রীর অন্তর্বাস থেকে মোট ১ হাজার ৫০০ গ্রাম সোনা পেস্ট উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা সোনার আনুমানিক মূল্য ছিল ৩ কোটি টাকা।

গত ১৫ আগস্ট শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে আসা এক যাত্রীর ট্রলির গোপন চেম্বার থেকে ১৩৩ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ট্রলির ভেতর থেকে লুকানো অবস্থায় ২ হাজার ৫৮৯ পিস ওষুধও জব্দ করা হয়।

এ ছাড়া ৫ আগস্ট বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের সময় প্যান্টের পকেটে লুকানো ১০০ গ্রাম সোনা জব্দ করা হয়।

চট্টগ্রামে বড় সিগারেটের চালান আটক

সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সিগারেটের চালান আটকের ঘটনা ঘটে ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইএ১৪৮ ফ্লাইটে নজরদারি চালিয়ে তিন যাত্রীর কাছ থেকে ৭৮২ কার্টন প্ল্যাটিনাম ও মন্ড সিগারেট এবং ১৩টি আইফোন উদ্ধার করা হয়।

একই ফ্লাইটের ২ নম্বর ব্যাগেজ বেল্টে একটি পরিত্যক্ত ব্যাগেজ থেকে আরও ১ হাজার ২০ কার্টন সিগারেট উদ্ধার করা হয়।

একক এই চালানেই জব্দ করা পণ্যের শুল্ক-করসহ মূল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

নিষিদ্ধ বিউটি ক্রিম, ভ্যাপ ও মদ জব্দ

চোরাচালানের তালিকায় রয়েছে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর প্রসাধনীও। উচ্চ শুল্ক এড়াতে এবং বাজারে চাহিদা থাকায় বিভিন্ন ফ্লাইটে এসব পণ্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

গত ১৭ আগস্ট বিমানবন্দরের ফরেন পোস্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে ৩১৯ কেজি নিষিদ্ধ বিউটি ক্রিম উদ্ধার করা হয়।

২০ ও ২১ আগস্ট পৃথক অভিযানে শত শত কেজি নিষিদ্ধ গৌরি ক্রিম, ভ্যাপ লিকুইড, মিল্ক পাউডার এবং একাধিক আইফোন জব্দ করা হয়।

এ ছাড়া ১২ ও ১৫ আগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে আসা একাধিক যাত্রীর লাগেজ থেকে দামি ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ মদ আটক করা হয়েছে।

মিথ্যা ঘোষণায় রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা

শুধু বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চোরাচালান নয়, আমদানি পণ্যে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করেছে সিআইআইডি।

গত ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সুলতানা করপোরেশনের একটি চালানে মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত করে।

এ ঘটনায় অতিরিক্ত রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ ৭১ লাখ ৭২ হাজার ৬০৬ টাকা চূড়ান্ত করা হয়।

সাড়ে ৫ হাজার ডলারের ঘোষণায় প্রায় ২ কোটি টাকার পণ্য

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকায় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির আরও বড় একটি ঘটনা শনাক্ত করেছে সিআইআইডি।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ আগস্ট দুটি চালানের খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরে ২৩ আগস্ট প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে চালান দুটির কায়িক পরীক্ষা করা হয়।

সিআইআইডির তথ্য অনুযায়ী, সরদার গ্লোবাল ট্রেড নামের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের খালাসকারী প্রতিনিধি ফাহিম ফাইভ স্টার লিমিটেডের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশে আনা হয়।

দুটি চালানে সম্মিলিতভাবে মাত্র সাড়ে ৫ হাজার মার্কিন ডলার আমদানি মূল্য ঘোষণা করা হলেও কায়িক পরীক্ষায় প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যমানের ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, আইপ্যাড ও গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়, নামমাত্র মূল্য ঘোষণা করে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির মাধ্যমে বড় অঙ্কের শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।

শুল্ক ফাঁকি ও চোরাচালান রোধে জোরদার হচ্ছে নজরদারি

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানিয়েছেন, শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন ও দ্রুত পণ্য খালাস, বকেয়া রাজস্ব আদায় ও মামলা নিষ্পত্তি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

পাশাপাশি নিলাম কার্যক্রমের গতিও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিমানবন্দর ও সীমান্তকেন্দ্রিক গোয়েন্দা নজরদারি আরও শক্তিশালী হলে চোরাচালানকারীদের নতুন নতুন কৌশল প্রতিরোধের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। একই সঙ্গে বৈধ পথে পণ্য আমদানি ও প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে মানুষের আস্থাও বাড়তে পারে।

এক নজরে আগস্টের উল্লেখযোগ্য অভিযান
১৭ আগস্ট শাহজালালে ৮৮১ গ্রাম সোনা পেস্ট জব্দ।
৩ আগস্ট শাহ আমানতে অন্তর্বাস থেকে ১ হাজার ৫০০ গ্রাম সোনা উদ্ধার।
১৫ আগস্ট ট্রলির গোপন চেম্বার থেকে ১৩৩ গ্রাম সোনা ও ২ হাজার ৫৮৯ পিস ওষুধ জব্দ।
১৭ আগস্ট শাহ আমানতে ১ হাজার ৮০২ কার্টন সিগারেট ও ১৩টি আইফোন উদ্ধার।
একই ঘটনায় জব্দ পণ্যের শুল্ক-করসহ মূল্য ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
১৭ আগস্ট ফরেন পোস্ট অফিসে ৩১৯ কেজি নিষিদ্ধ বিউটি ক্রিম জব্দ।
৪ আগস্ট সুলতানা করপোরেশনের চালানে ৭১ লাখ ৭২ হাজার ৬০৬ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব ও জরিমানা নির্ধারণ।
শাহজালালের এয়ারফ্রেইটে সাড়ে ৫ হাজার ডলার ঘোষণার বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকার পণ্য শনাক্ত।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!