ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

স্ক্র্যাপের নামে পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য আমদানিতে কঠোর এনবিআর, লঙ্ঘন হলে আইনি ব্যবস্থা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ০৯:৫১ এএম

স্ক্র্যাপের নামে পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য আমদানিতে কঠোর এনবিআর, লঙ্ঘন হলে আইনি ব্যবস্থা

ছবিঃ সংগৃহীত

আমদানি নীতি আদেশ লঙ্ঘন করে ‘ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপ’ বা বর্জ্য ও লোহার টুকরোর নামে পুনঃব্যবহারযোগ্য অন্য কোনো পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রচলিত নীতিমালা অমান্য করে স্ক্র্যাপ হিসেবে অন্য ধরনের পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য আমদানি করা হলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এনবিআরের কাস্টমস নীতি বিভাগের দ্বিতীয় সচিব রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিপত্রটি জারি করা হয়েছে।

শুধু প্রকৃত স্ক্র্যাপ আমদানির সুযোগ

এনবিআরের পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী কেবল প্রকৃত ব্যবহারকারী হিসেবে স্বীকৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোই কাঁচামাল হিসেবে এইচএস হেডিং ৭২.০৪-এর আওতাভুক্ত ‘ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপ’ আমদানি করতে পারবে।

অর্থাৎ, আমদানি নীতিতে নির্ধারিত শ্রেণি ও এইচএস কোডের আওতাভুক্ত প্রকৃত বর্জ্য বা স্ক্র্যাপ ছাড়া অন্য কোনো পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্যকে স্ক্র্যাপ হিসেবে ঘোষণা করে আমদানির সুযোগ নেই।

এনবিআর বলছে, সম্প্রতি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে—কিছু আমদানিকারক স্ক্র্যাপের ঘোষণা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে পুনঃব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য দেশে আনছেন। এসব পণ্য প্রকৃত স্ক্র্যাপ না হলেও অন্য এইচএস কোড ব্যবহার করে আমদানি করা হচ্ছে বলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

স্ক্র্যাপ ঘোষণায় অন্য পণ্য আমদানি বেআইনি

পরিপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রচলিত আমদানি নীতি আদেশে উল্লিখিত এইচএস হেডিং ৭২.০৪-এর অধীন প্রকৃত স্ক্র্যাপ ছাড়া অন্য কোনো এইচএস কোডের পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্যকে স্ক্র্যাপ হিসেবে ঘোষণা করে আমদানি করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

এর ফলে আমদানিকারকরা পণ্যের প্রকৃত ধরন গোপন করে বা ভুলভাবে স্ক্র্যাপ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে শুল্ক-কর বা আমদানি নীতির সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বন্দরে পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের মিল না পেলে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। এনবিআরের নতুন নির্দেশনায় এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের আরও কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টে একাধিক রিটের পর এনবিআরের পরিপত্র

স্ক্র্যাপের নামে পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য আমদানির বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বন্দর বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব পণ্য আটকে দেওয়ার পর খালাসের দাবিতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একাধিক রিট পিটিশন করা হয়।

এর মধ্যে রিট পিটিশন নম্বর ৭৫৯৫/২০২৫ ও ৬৪০৬/২০২৫ উল্লেখযোগ্য।

এসব রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, প্রচলিত আমদানি নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো পণ্য দেশে আমদানির সুযোগ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি ও পরিপত্র জারির জন্য এনবিআরকে মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।

আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই এনবিআর নতুন করে পরিপত্র জারি করে আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছে।

এইচএস কোডের সঠিক ঘোষণা বাধ্যতামূলক

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানি করা পণ্যের ধরন নির্ধারণ, শুল্ক-কর আরোপ এবং বিভিন্ন নীতিগত বিধিনিষেধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে এইচএস কোড গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটি পণ্যকে প্রকৃত শ্রেণির পরিবর্তে অন্য কোনো এইচএস কোডে ঘোষণা করলে তা আমদানি নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এনবিআরের নির্দেশনার মূল বিষয় হলো—যে পণ্য প্রকৃত অর্থে ‘ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপ’, সেটিই নির্ধারিত এইচএস হেডিংয়ের আওতায় আমদানি করা যাবে। পুনঃব্যবহারযোগ্য বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অন্য কোনো পণ্যকে স্ক্র্যাপের পরিচয়ে দেশে আনা যাবে না।

লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা

এনবিআর জানিয়েছে, কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে আমদানি নীতি আদেশের বিধান লঙ্ঘন করে স্ক্র্যাপের নামে অন্য পণ্য আমদানি করলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে পণ্যের ঘোষণা, প্রকৃত পণ্যের ধরন এবং প্রযোজ্য এইচএস কোডের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না—এসব বিষয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করবে।

আমদানিকারকদের প্রতি সতর্কবার্তা

এনবিআরের পরিপত্রের মাধ্যমে আমদানিকারকদের মূলত সতর্ক করা হয়েছে যে, পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে বা ভুল এইচএস কোড ব্যবহার করে আমদানি করার সুযোগ নেই। আমদানি নীতি আদেশে যেসব পণ্যের জন্য যে শর্ত ও শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে স্ক্র্যাপ আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারককে নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা মেনে চলতে হবে। অন্যথায় পণ্য আটকে যাওয়া থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এনবিআরের এই নির্দেশনা?

স্ক্র্যাপের নামে পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্য আমদানি করা হলে একদিকে আমদানি নীতির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে, অন্যদিকে পণ্যের প্রকৃত শ্রেণি অনুযায়ী শুল্ক-কর আদায় এবং কাস্টমস নিয়ন্ত্রণেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা আমদানিকারকদের সঙ্গে অনিয়মকারীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ কারণে আদালতের নির্দেশনার পর এনবিআরের এই পরিপত্রকে আমদানি নীতি বাস্তবায়ন এবং পণ্যের সঠিক ঘোষণা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সারকথা: প্রকৃত ‘ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপ’ ছাড়া অন্য কোনো পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্যকে স্ক্র্যাপ হিসেবে ঘোষণা করে আমদানি করা যাবে না। আমদানি নীতি আদেশের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!