জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড মওকুফ করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। রাষ্ট্রপতির কাছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের করা দণ্ড মওকুফের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। দণ্ড মওকুফের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে আরোপ করা বিভাগীয় শাস্তির ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনের পর দণ্ড মওকুফ
আইআরডি সূত্রে জানা গেছে, এনবিআর সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের কয়েকজন রাষ্ট্রপতির কাছে দণ্ড মওকুফের আবেদন করেন।
সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোববার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
এ সিদ্ধান্ত এনবিআরের সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালে এনবিআর সংস্কার নিয়ে আন্দোলন
২০২৫ সালে এনবিআর সংস্কারের দাবিতে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে কর্মসূচি জোরালো হলে এর প্রভাব দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও পড়ে।
আন্দোলনের কারণে কাস্টমস ও রাজস্ব-সংক্রান্ত কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ দেখা দেয়। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী নেতারা মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় একপর্যায়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন আন্দোলনকারী কর্মকর্তারা।
৩৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা
আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে পরবর্তী সময়ে মোট ৩৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় আইআরডি।
তাদের মধ্যে এনবিআরের তিন সদস্য ও একজন কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তাঁদের সম্পৃক্ততার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ নিয়ে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পরে শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ দণ্ড মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন।
এর আগে ২৪ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফের উদ্যোগ
এর আগে আন্দোলনে সম্পৃক্ত ২৪ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে আয়কর ক্যাডারের ১৪ জন এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ক্যাডারের ১০ কর্মকর্তা ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁদের ওপর আরোপিত দণ্ড মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। সেই আবেদনের ধারাবাহিকতায় দণ্ড মওকুফের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
সর্বশেষ ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
যেসব কর্মকর্তা দণ্ড মওকুফ পেলেন
আইআরডির জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দণ্ড মওকুফ হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন—
ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল, উপকর কমিশনার, কর অঞ্চল-২১, ঢাকা;
মির্জা আশিক রানা, অতিরিক্ত কর কমিশনার, কর অঞ্চল-দিনাজপুর;
মোনালিসা শাহরীন সুমিতা, যুগ্ম কর কমিশনার, কর অঞ্চল-ময়মনসিংহ;
মো. মামুন মিয়া, যুগ্ম কর কমিশনার, কর অঞ্চল-যশোর;
চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব), কর অঞ্চল-গাজীপুর;
সুলতানা হাবীব, অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব), কর অঞ্চল-১২, ঢাকা;
মুরাদ আহমেদ, অতিরিক্ত কর কমিশনার, কর অঞ্চল-যশোর;
মামুনা খাতুন, যুগ্ম কর কমিশনার, ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট ইউনিট, ঢাকা;
মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন খান, যুগ্ম কর কমিশনার, কর অঞ্চল-ফরিদপুর;
এ ছাড়া মো. জিল্লুর রহমানসহ আরও কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে।
এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
এনবিআরের কাঠামো, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আরও কার্যকর করার দাবিতে ২০২৫ সালে কর্মকর্তাদের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজস্ব প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক টানাপোড়েন তৈরি হয়।
একপর্যায়ে আন্দোলনের প্রভাব কাস্টমস ও অন্যান্য রাজস্ব কার্যক্রমে পড়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
পরে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।
দণ্ড মওকুফের সিদ্ধান্তে নতুন মাত্রা
আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং পরবর্তী সময়ে দণ্ড মওকুফের আবেদন—পুরো বিষয়টি এনবিআরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দণ্ড মওকুফের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার একটি অংশের নিষ্পত্তি হলো। তবে আন্দোলনে সম্পৃক্ত অন্য কর্মকর্তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে এনবিআর সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মকর্তাদের পেশাগত পরিবেশ—এসব বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
কেন এনবিআর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
২০২৫ সালে এনবিআর সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। আন্দোলনের একপর্যায়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল।
কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ৩৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
কতজন কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে?
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। তাঁদের দণ্ড মওকুফের আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে করা হয়েছিল।
এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব কী হয়েছিল?
আন্দোলনের একপর্যায়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। পরে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

