ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

মোংলা বন্দরে বাড়ছে জাহাজ-রাজস্ব, তবু বাধা নাব্যতা ও অবকাঠামো সংকটে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম

মোংলা বন্দরে বাড়ছে জাহাজ-রাজস্ব, তবু বাধা নাব্যতা ও অবকাঠামো সংকটে

ছবিঃ সংগৃহীত

সাগর পেরিয়ে নদীপথ ধরে একের পর এক জাহাজ আসছে মোংলা বন্দরে। বন্দরের জেটিতে চলছে পণ্য ওঠানামা। বাড়ছে জাহাজের আনাগোনা, বাড়ছে রাজস্ব আয়। বন্দরকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়েও তৈরি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মোংলা বন্দরের সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নাব্য সংকট, পর্যাপ্ত জেটির অভাব, কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এবং বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কের বেহাল দশা—সব মিলিয়ে আমদানি-রপ্তানিকারকদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বড় ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে না পারায় পণ্য পরিবহন ও জাহাজ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি জটিলতা।

নাব্য সংকটে বড় জাহাজ

মোংলা বন্দরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ নাব্যতা। বড় ড্রাফটের জাহাজ বন্দরে প্রবেশ ও নিরাপদে জেটিতে ভেড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতা সব সময় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বন্দরের সম্ভাব্য সক্ষমতা অনুযায়ী বড় আকারের জাহাজ ও বেশি পরিমাণ পণ্য হ্যান্ডলিং করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত ড্রেজিং ও নাব্যতা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মোংলা বন্দরে আরও বড় জাহাজ আনা সম্ভব হবে। এতে একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে, বাড়বে জাহাজের সংখ্যা এবং আমদানি-রপ্তানির পরিমাণও বাড়তে পারে।

জেটি স্বল্পতায় সীমিত পণ্য ওঠানামা

নাব্যতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জেটির অভাবও বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাহাজের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী পণ্য ওঠানামার অবকাঠামো না বাড়ালে বন্দরের ওপর চাপ তৈরি হবে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, আধুনিক টার্মিনাল ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা বাড়ানো গেলে মোংলা বন্দরকে আরও কার্যকর বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত করা সম্ভব।

নৌপরিবহনমন্ত্রী রবিউল ইসলাম বলেন, টার্মিনাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেটি ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ড্রাফট নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সড়কপথে বাড়ছে সময় ও পরিবহন খরচ

মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগও ব্যবসায়ীদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে বন্দর থেকে কাটাখালী পর্যন্ত সড়কের সরু ও বেহাল অবস্থার কারণে পণ্যবাহী যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

তাঁদের ভাষ্য, সড়কের অবস্থা ভালো না হওয়ায় পণ্য পরিবহনে সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানিকারকদের ওপর পড়ছে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘বন্দর থেকে কাটাখালীর যে রাস্তা, এ রাস্তা গাড়ি চলাচলের জন্য উপযোগী না।’

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় মোংলা বন্দরে একটি কনটেইনার পরিবহনে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, মোংলা বন্দর ব্যবহার করেও কেন ব্যবসায়ীদের এই বাড়তি খরচ বহন করতে হবে?

চিংড়ি রপ্তানিতেও সংকট

মোংলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে চিংড়ি রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে রপ্তানিকারকদের জন্য জাহাজ সংকট ও পণ্য পরিবহনের নানা জটিলতা নতুন চাপ তৈরি করছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সময়মতো জাহাজ পাওয়া না গেলে রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁদের মতে, বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি জাহাজ চলাচল বাড়ানো গেলে চিংড়িসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্য পরিবহনে গতি আসবে।

রাজস্ব পরিশোধে হয়রানির অভিযোগ

অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি বন্দরে রাজস্ব পরিশোধ ও সংশ্লিষ্ট সেবা নিতে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে ব্যবসায়ীদের। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় জটিলতার কারণে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।

ব্যবসায়ীদের এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। সরকারের লক্ষ্য মোংলা বন্দরকে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে বড় সম্ভাবনা

মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন শিল্প ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীনসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহকে কাজে লাগাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মোংলাকে কেন্দ্র করে একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল আমাদের পরিকল্পনার অংশ—জাতীয়ভাবে, আঞ্চলিক না।’

বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফাও অর্থনৈতিক অঞ্চল ও কনটেইনার টার্মিনালকে মোংলা বন্দরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কনটেইনার টার্মিনাল হলে বন্দরের সুফল আরও ব্যাপকভাবে পাওয়া যাবে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

বিনিয়োগ বাড়লে বদলে যেতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

অর্থনৈতিক অঞ্চল, কনটেইনার টার্মিনাল এবং উন্নত নৌ ও সড়ক যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মোংলা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, লজিস্টিকস, শিপিং, পণ্য খালাস এবং বিভিন্ন সেবাখাতেও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বন্দরের ভেতরের অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না। নৌপথের নাব্যতা, জেটি ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, সড়ক যোগাযোগ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৮১৫ বিদেশি জাহাজ, রাজস্ব ৩৮৮ কোটি টাকা

পরিসংখ্যানও মোংলা বন্দরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে ৮১৫টি বিদেশি জাহাজ এসেছে। একই সময়ে বন্দর থেকে ৩৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় বন্দরের সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নাব্যতা নিশ্চিত করা গেলে জাহাজ ও পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব।

ফলে এখন মোংলা বন্দরের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক সম্ভাবনার সঙ্গে অবকাঠামোগত সক্ষমতার সমন্বয় করা। নাব্যতা, জেটি, কনটেইনার টার্মিনাল ও সড়ক যোগাযোগের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা গেলে মোংলা শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, দেশের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাব হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!