ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

শ্রম মন্ত্রণালয়ে ‘সিন্ডিকেটের’ দাপট, বদলি-বাণিজ্য ও সার্ভিস রুল ঘিরে নানা অভিযোগ

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

শ্রম মন্ত্রণালয়ে ‘সিন্ডিকেটের’ দাপট, বদলি-বাণিজ্য ও সার্ভিস রুল ঘিরে নানা অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

শ্রমিকের পক্ষে মত দেওয়ায় কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলি, বিএটির সার্ভিস রুল অনুমোদনে তড়িঘড়ি—মন্ত্রণালয়ের ভেতরে-বাইরে উঠছে প্রশ্ন
বিশেষ অনুসন্ধান
দেশের শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প খাতে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের, সেই শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড ঘিরে উঠছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তরগুলোতে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একটি বলয়, পদায়ন-বদলি ঘিরে অনিয়ম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুল অনুমোদনে তড়িঘড়ি এবং শ্রমিকস্বার্থে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে
মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন দপ্তরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শামসুল ইসলাম, মাসুকুর সিকদার, কুদ্দুস আলী, তাহমিনা বেগম, জাহাঙ্গীর আলম ও মোজাম্মেল হোসেনসহ কয়েকজনের নাম বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
তবে এসব কর্মকর্তার অতীত ভূমিকা ও বর্তমান দায়িত্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং সরকারি নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘সিলেট সিন্ডিকেট’—অভিযোগের কেন্দ্রে কয়েকজন কর্মকর্তা
মন্ত্রণালয়ের ভেতরে সিলেট অঞ্চলের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় বা ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, সচিব আবদুর রহমান তরফদার, তাঁর একান্ত সচিব ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শামীম, যুগ্মসচিব কুদ্দুস আলী, উপসচিব ইরতিজা এবং মন্ত্রীর পিএস ও উপসচিব শামছুলকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পদায়নে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে।


অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও পদে বদলি-পদায়নের বিষয়েও এই বলয়ের প্রভাব রয়েছে। এসব বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সবকিছু অবগত নন বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও নেওয়া জরুরি।
শ্রমিকের পক্ষে মত, এরপরই ‘শাস্তিমূলক’ বদলি?
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) কুষ্টিয়া কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক ফরহাদ ওয়াহাবের বদলি।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটি) আউটসোর্সিং ফিল্ড টেকনিশিয়ানদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে শ্রম বিধিমালার বিধি ১৮(২), বিধি ১৬(৫) এবং শ্রম আইনের ধারা ৩ অনুসারে শ্রমিকদের পক্ষে মতামত দেওয়ার পর তাঁকে কুষ্টিয়া থেকে দিনাজপুরে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—শ্রমিকের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা যদি প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
শ্রমিকস্বার্থে দেওয়া মতামতের সঙ্গে বদলির কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএটির সার্ভিস রুল অনুমোদনে কেন এত তাড়াহুড়া?
বিএটি বাংলাদেশের কর্মীদের নিয়োগ, চাকরিচ্যুতি, সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য বিষয়ে সার্ভিস রুল জমা দেওয়ার পর সেটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির বিভিন্ন নীতিমালা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণভাবে পর্যালোচনা না করেই দ্রুত অনাপত্তি দেওয়ার জন্য ডিআইএফইর কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি এক ঘণ্টার মধ্যে মতামত দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়েকজন কর্মকর্তা এতে সম্মত না হওয়ায় পরবর্তীতে সীমিত কিছু মতামত যুক্ত করে সার্ভিস রুল অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বিএটি বাংলাদেশের দুটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকা সত্ত্বেও সার্ভিস রুল সংশোধনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতামত বাদ দিয়ে কোনো সার্ভিস রুল অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকলে সেটি শ্রমিক অধিকার ও অংশগ্রহণের নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অবসরের আগে কেন ‘তড়িঘড়ি’?
মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শ্রম সচিব আবদুর রহমান তরফদার চলতি মাসেই অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। আর এর আগেই বিএটির সার্ভিস রুল অনুমোদন এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের দিয়ে স্থায়ী ধরনের কাজ করানোর বিষয়টি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, সার্ভিস রুল, ট্রেড ইউনিয়নের মতামত এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ফাইল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিনিধি’র মতো আচরণের অভিযোগ
ডিআইএফইর অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও যুগ্মসচিব আরিফ আহমেদ খানের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের দাবি, বড় বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধির মতো আচরণ করেন তিনি। বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া এবং কারখানা পরিদর্শনের সময় অধীনস্থ শ্রম পরিদর্শকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
কুষ্টিয়া অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মিরপুর লিফ ডিপোর রেস্টহাউসে তিনি নিয়মিত রাত্রিযাপন করতেন বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
এ অভিযোগের বিষয়ে আরিফ আহমেদ খানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ছয় মাসেও মহাপরিচালক নেই
শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে মহাপরিচালক পদে স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি। যুগ্মসচিব আব্দুস সামাদ আজাদকে দিয়ে রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ঢাকার ডিআইজি ও গাজীপুরের ডিআইজি পদে অর্থের বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। এসব পদায়নকে ঘিরে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার প্রভাব সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, বদলি-পদায়নে অনিয়মের কারণে কারখানা মালিকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার বাস্তবায়নে।
ইরতিজার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২২ লাখ টাকার মালয়েশিয়া সফর
উপসচিব ইরতিজাকে ঘিরেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে এবং এ কারণে তাঁর পদোন্নতি আটকে আছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ২০২৬ সালের ২৪ থেকে ২৮ জুন মালয়েশিয়া সফর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ব্যয় সংকোচনসংক্রান্ত নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজস্ব বাজেট থেকে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তাসনুবা আহমেদ অনন্যাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ওই সফরে যান।
সফরের সরকারি আদেশ বা জিও ২৩ জুন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সফরটির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের কোনো আমন্ত্রণপত্র ছিল না বলেও মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে।
তবে সরকারি সফরের অর্থায়ন, জিও প্রকাশ ও প্রত্যাহার এবং আমন্ত্রণপত্রের বিষয়টি সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তের দাবি
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন দপ্তরগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ শুধু ব্যক্তি কর্মকর্তার অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুশাসন এবং সরকারি প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা জড়িত।
বিশেষ করে শ্রমিকের পক্ষে মত দেওয়ার পর কোনো কর্মকর্তার বদলি হয়ে থাকলে, সার্ভিস রুল অনুমোদনে অস্বাভাবিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ থাকলে, পদায়ন-বদলিতে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে কিংবা সরকারি অর্থে বিদেশ সফরে বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে—প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট নথি, বদলি-পদায়নের ফাইল, সার্ভিস রুল অনুমোদন প্রক্রিয়া, ট্রেড ইউনিয়নের মতামত, বিদেশ সফরের জিও ও ব্যয়ের হিসাব এবং কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
শ্রমিকের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষায় অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!