ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ কতটা কার্যকর, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ

প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৬, ১১:২৭ এএম

দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ কতটা কার্যকর, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

ছবিঃ সংগৃহীত

‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’—প্রচলিত এই প্রবাদে আর্থিক অনটনের চাপে মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বোঝানো হলেও দুর্নীতির বাস্তবতা কেবল অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার প্রতি অতি আকাঙ্ক্ষা, রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রবণতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির ঘাটতি এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগও দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের পথে দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আলোচিত। তাই দুর্নীতি দমনে শুধু ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাই এখন বড় প্রয়োজন।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলছে। তবে এই নীতির বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, তদন্তের কার্যকারিতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।

দুর্নীতি শুধু অর্থের অনিয়ম নয়

সাধারণ অর্থে দুর্নীতি হলো দায়িত্ব, ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠানের সুযোগকে ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থে অনৈতিক ও বেআইনিভাবে ব্যবহার করা। ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, টেন্ডারে অনিয়ম, নিয়োগে পক্ষপাত, সম্পদের প্রকৃত মূল্য গোপন, কর ফাঁকি কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জন—সবই দুর্নীতির বিভিন্ন রূপ হতে পারে।

কেউ কেউ মনে করেন, অভাব মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। বাস্তবে দেখা যায়, দুর্নীতির সঙ্গে লোভ, ক্ষমতা, সুযোগ এবং জবাবদিহির অভাবও গভীরভাবে যুক্ত। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার পরও অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় দুর্নীতিতে জড়াতে পারেন।

এ কারণেই দুর্নীতি মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, সুশাসন এবং এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেখানে দুর্নীতি করে পার পাওয়ার সুযোগ কমে আসে।

‘জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ’ কেন আলোচনায় আসে

দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ’ শব্দবন্ধটি প্রায়ই সামনে আসে। কোনো ব্যক্তির বৈধ ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তার দৃশ্যমান সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে প্রশ্ন ওঠে—সম্পদের উৎস কী?

এখানেই সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচার তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই তিনি দুর্নীতির জন্য দোষী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। যথাযথ তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হয়।

ছোট অনিয়ম থেকেই বড় দুর্নীতির বিস্তার

দুর্নীতি সবসময় বড় অঙ্কের ঘুষ বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে শুরু হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো অনিয়ম ধীরে ধীরে বড় ব্যবস্থাগত দুর্নীতির জন্ম দেয়।

উদাহরণ হিসেবে জমি বা বাড়ি কেনাবেচার সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দলিলে দেখানোর বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এতে সরকার প্রাপ্য নিবন্ধন ফি বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত লেনদেনের অর্থের একটি অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া, নিয়োগে তদবির, প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ, সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার—এসব ছোট বা বড় অনিয়মও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

উন্নয়নের পথে দুর্নীতি কেন বড় বাধা

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন, কার্যকর আইন, ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশ।

দুর্নীতি এসব ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি হলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে, কাজের মান কমতে পারে এবং জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ঘুষ ও অনিয়ম বাড়লে সৎ উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। সরকারি সেবায় দুর্নীতি থাকলে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়।

ফলে দুর্নীতির অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্যের ওপরও।

দুর্নীতির জন্য পুরো জনগণ দায়ী নয়

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ দুর্নীতির শিকার ও ভুক্তভোগী।

সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া, হয়রানির শিকার হওয়া, নিয়োগ বা ব্যবসায়িক কাজে অনিয়মের মুখোমুখি হওয়া—এসব পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকের দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয় এক নয়।

তাই দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়া ও কাঠামো চিহ্নিত করা জরুরি।

‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা

দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে। কিন্তু ঘোষণার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তিনি যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা যায় কি না—সেটিই হবে নীতিটির বাস্তব পরীক্ষা।

একইভাবে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করে তা যদি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, মামলা হলেও বিচার শেষ না হয় কিংবা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

দুর্নীতি দমনে প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা জরুরি

দুর্নীতি দমন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালতসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানের তদন্ত যেন স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়, তদন্ত কর্মকর্তারা যেন অযাচিত চাপের বাইরে থেকে কাজ করতে পারেন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়—এগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

দুর্নীতি দমনের লড়াই শুরু হয় সৎ ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে। সরকারি নিয়োগ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

তাই নিয়োগে মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ, ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার।

শুধু শাস্তির ভয় দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা কঠিন। কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

টেন্ডার ও সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বাড়ানো দরকার

সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্প দুর্নীতির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। টেন্ডারে যোগসাজশ, অস্বাভাবিক দর, নিম্নমানের কাজ, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাজ শেষ না করেই বিল পরিশোধের মতো অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে।

এক্ষেত্রে ই-জিপি বা ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করলেই হবে না; টেন্ডারের তথ্য, মূল্যায়ন, চুক্তি, বাস্তবায়ন এবং অর্থ পরিশোধের প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়াতে হবে।

বড় সরকারি চুক্তি ও প্রকল্পে তথ্য প্রকাশের পরিধি বাড়ানো হলে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও নজরদারিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল ব্যবস্থা দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে

দুর্নীতি কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো মানুষের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তার অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমানো।

অনলাইনে আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-ফাইলিং, স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন, অনলাইন ট্র্যাকিং এবং সেবার অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগী ও ঘুষের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে কমানো সম্ভব।

বিশেষ করে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। কারণ নগদ অর্থের লেনদেনের তুলনায় ডিজিটাল লেনদেনে আর্থিক রেকর্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং বাংলা কিউআর-এর মতো উদ্যোগ এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বড় বাধা

দুর্নীতি দমনে তদন্তের পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকলে অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী—উভয় পক্ষের ওপরই এর প্রভাব পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে হতাশা তৈরি হতে পারে।

তাই দুর্নীতি মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, দক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং অযথা দীর্ঘসূত্রতা কমানো প্রয়োজন।

তবে দ্রুত বিচার বলতে যেন ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচারই হওয়া উচিত দুর্নীতি দমনের ভিত্তি।

বিএনপির ‘জিরো টলারেন্স’ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বড় পরীক্ষা

দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করেছে। দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করা, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা, জনপ্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জনমুখী করা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, বড় রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও টেন্ডারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং ওপেন ডাটা ব্যবস্থার মতো উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।

এখন এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে কার্যকর হয়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। কারণ দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দল-মত ও ব্যক্তি পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে সমানভাবে প্রয়োগ করা যায়।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দুর্নীতি দমন কঠিন

দুর্নীতি দমনে আইন ও প্রতিষ্ঠান যতই শক্তিশালী হোক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ যদি দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বিশেষ সুবিধা পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের সমতার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান হতে হবে সর্বজনীন। ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে যেমন আইন প্রয়োগ হবে, তেমনি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ডে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে নাগরিকের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

দুর্নীতি দমন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। নাগরিকদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ঘুষ না দেওয়া, অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা, সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলা, কর ও ফি যথাযথভাবে পরিশোধ করা এবং দুর্নীতির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এসব নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

দুর্নীতির চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ বেশি কার্যকর

দুর্নীতি ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

কোনো সরকারি অফিসে ঘুষের অভিযোগ বেশি হলে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি না করে পুরো সেবা প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোথায় নাগরিককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কর্মকর্তার কাছে যেতে হচ্ছে, কোথায় অনুমোদনের অতিরিক্ত ধাপ রয়েছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে—এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

অর্থাৎ দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থা শনাক্ত করাও জরুরি।

সামনে যে সংস্কারগুলো জরুরি

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

প্রথমত, দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, সরকারি নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

তৃতীয়ত, সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো।

চতুর্থত, সরকারি সেবাকে যতটা সম্ভব অনলাইন ও স্বয়ংক্রিয় করা।

পঞ্চমত, সম্পদ বিবরণী ও আর্থিক লেনদেনে কার্যকর যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলা।

ষষ্ঠত, দুর্নীতি মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো।

সপ্তমত, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তি ও অভিযোগকারীদের আইনসম্মত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

অষ্টমত, স্কুল-কলেজ থেকেই নৈতিকতা, সততা ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা।

শেষ কথা

দুর্নীতি কোনো একদিনে তৈরি হওয়া সমস্যা নয়। এটি ব্যক্তিগত লোভ, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির ঘাটতির সম্মিলিত ফল হতে পারে।

তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইও হতে হবে বহুমাত্রিক। শুধু ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা নয়—তার বাস্তব প্রয়োগ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার, ডিজিটাল সেবা, স্বচ্ছ সরকারি ক্রয় এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয় প্রয়োজন।

রাষ্ট্র যদি দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি জবাবদিহির আওতায় থাকে এবং নাগরিকরা যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তাহলে দুর্নীতির বিস্তার ঠেকানো সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ মানুষের বিবেক ও নৈতিকতার জায়গা থেকেই আসে। তবে সেই বিবেককে শক্তিশালী করতে রাষ্ট্রের আইন, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি কার্যকর ভূমিকা রাখে, তবেই একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও সুদৃঢ় হতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!