সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ দাবি করা হচ্ছে—নাগরিকদের এমন অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য চালু হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল ১০টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটটিতে ৯ হাজার ৯২৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা বলে সাইটটির তথ্য থেকে জানা গেছে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন। তার দাবি, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ঘুষসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা আসে। ভারতীয় একটি ঘুষবিরোধী ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিকভাবে সাইটটি তৈরি করেন তিনি।
‘ঘুষ.সাইট’ মূলত নাগরিকদের কাছ থেকে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা ও দাবিকৃত অর্থের তথ্য সংগ্রহের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করেই কোনো সরকারি সেবা গ্রহণের সময় ঘুষ চাওয়া হয়েছে কি না, কোন ধরনের সেবা নিয়ে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং কত টাকা দাবি করা হয়েছে—এসব তথ্য জমা দিতে পারেন।
সাইটটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত হয়রানি বা সরাসরি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকারি সেবা খাতে ঘুষের প্রবণতা ও ব্যাপ্তির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সাইটটিতে বিভিন্ন সরকারি দফতর ও সেবার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রশাসনিক বিভাগের ভিত্তিতেও তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে কোন এলাকায় বা কোন ধরনের সরকারি সেবায় ঘুষের অভিযোগ বেশি জমা পড়ছে, তা তুলনামূলকভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
‘ঘুষ.সাইট’-এর তথ্য কাঠামোতে অভিযোগগুলোকে মূলত দুটি দিক থেকে দেখা হচ্ছে—একদিকে দেশের ভৌগোলিক বা প্রশাসনিক বিভাগ, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সরকারি সেবা বা দফতর।
ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)সহ বিভিন্ন সরকারি সেবা ঘিরে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা এখানে উঠে আসছে। ফলে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ বেশি আসছে, তার একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক চিত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সাইটে জমা পড়া প্রতিটি অভিযোগকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। তাই এসব সংখ্যাকে নাগরিকদের জমা দেওয়া অভিযোগের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা প্রয়োজন; এগুলো প্রমাণিত দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
শাহেদ শরীফ আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে সরকারি অফিসে ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয়। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।
শাহেদের দাবি, মায়ের পেনশনের প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে তাকে একটি সরকারি অফিসে ঘুষের দাবির মুখোমুখি হতে হয়। পরে নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট প্রয়োজন হওয়ায় তিনি কয়েকদিন অপেক্ষা করেন। এরপর ঘুষ দেওয়ার দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই পাসপোর্ট হাতে পান বলে দাবি করেন শাহেদ।
এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে ভাবতে বাধ্য করে—দেশের অন্য মানুষও যদি একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় সংগ্রহ করে প্রকাশ করা যায় কি না।

দুই ঘণ্টায় তৈরি, পরে সহপাঠীর সহযোগিতায় চালু
শাহেদ জানান, ভারতীয় একটি ঘুষবিরোধী ওয়েবসাইট দেখে তিনি বাংলাদেশেও একই ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির চিন্তা করেন। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে ওয়েবসাইটটির প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি করেন।
পরে তার সহপাঠী সাইফের সহযোগিতায় ‘ঘুষ.সাইট’ চালু করা হয়। সাইটটির পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে শাহেদের দীর্ঘদিনের ফুলস্ট্যাক ডেভেলপমেন্টের অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে বলে তিনি জানান।
মাত্র ১০ দিনের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ জমা পড়ায় উদ্যোগটির প্রতি মানুষের আগ্রহের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
৩৩৪ কোটি টাকার অভিযোগ—তবে সবই যাচাইাধীন
সাইটটির তথ্য অনুযায়ী, ৯ হাজার ৯২৪টি অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা।
তবে এই অর্থকে সরকারি কর্মকর্তা বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবে লেনদেন হওয়া ঘুষের পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এগুলো নাগরিকদের দেওয়া অভিযোগ ও দাবিকৃত অর্থের হিসাব।
শাহেদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একটি মডারেশন টিম জমা পড়া অভিযোগগুলো যাচাই ও পর্যালোচনা করছে। আইনি ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।
ভবিষ্যতে আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাওয়া গেলে তথ্য আরও বিস্তৃতভাবে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি নয়, দুর্নীতির প্রবণতা চিহ্নিত করা
শাহেদের দাবি, ‘ঘুষ.সাইট’-এর মূল উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্মকর্তাকে হয়রানি করা নয়। বরং নাগরিকদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে কোন সরকারি সেবা খাতে ঘুষের অভিযোগ বেশি, কোথায় ঝুঁকি বেশি এবং কী ধরনের সেবায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে—তার একটি তথ্যভিত্তিক চিত্র তৈরি করা।
তার মতে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে প্রশাসনও দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক তথ্য পেতে পারে।
অর্থাৎ ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিযোগের পরিবর্তে একটি ডেটাভিত্তিক দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
শাহেদ জানান, এখন পর্যন্ত ‘ঘুষ.সাইট’ পরিচালনায় তার প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ওয়েবসাইটটির প্রযুক্তিগত কাজের বড় একটি অংশ তিনি নিজেই করছেন।
তবে তিনি এখনও একজন শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট পরিচালনা, অভিযোগ পর্যবেক্ষণ, তথ্য মডারেশন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছেন। ময়মনসিংহের সানকিপাড়ায় বাবার সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়।
শাহেদের পরিকল্পনা হলো, ভবিষ্যতে ‘ঘুষ.সাইট’-কে আরও বড় ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডারে পরিণত করা। এজন্য প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে তথ্য যাচাই, অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে ভুয়া অভিযোগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ, ব্যক্তিগত মানহানি ও তথ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে শক্তিশালী যাচাইব্যবস্থা থাকা জরুরি। কারণ কোনো ওয়েবসাইটে অভিযোগ জমা পড়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।
বাংলাদেশে সরকারি সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এসব অভিযোগকে এক জায়গায় এনে পরিসংখ্যান আকারে প্রকাশের উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
মাত্র ১০ দিনে প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ জমা পড়া দেখাচ্ছে, ঘুষ ও সরকারি সেবায় অনিয়মের অভিজ্ঞতা নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। এখন এই বিপুল তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা যায় এবং যাচাই করা তথ্য কীভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজে লাগানো যায়—সেটিই হতে পারে ‘ঘুষ.সাইট’-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
একজন কিশোরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে যদি নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই, নাগরিক গোপনীয়তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সরকারি সেবায় অনিয়ম শনাক্তকরণ ও জনসচেতনতা তৈরিতে এটি একটি কার্যকর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

