সন্তানস্নেহে লালন-পালন করে বড় করা দত্তকপুত্রের বিরুদ্ধেই প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি কৌশলে লিখে নেওয়া এবং পরে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। বর্তমানে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের সম্পদ, নিরাপত্তা, খাবার ও চিকিৎসা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে বলে অভিযোগ তাঁর।
চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়নের কলেজপাড়া গ্রামে। ভুক্তভোগী মো. আমিনুর রহমান (৭০) পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। এ ঘটনায় তিনি ডিমলা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
দত্তক নিয়ে সন্তানের মতো বড় করেন রাজুকে
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিঃসন্তান আমিনুর রহমান প্রায় ১৪ বছর আগে রাকিবুল ইসলাম রাজু (৪২) নামের এক শিশুকে দত্তক নেন। এরপর নিজের সন্তানের মতো স্নেহ-মমতায় তাকে লালন-পালন করে বড় করেন তিনি।
পরবর্তীতে নিজের স্ত্রীর ভাগ্নি শিউলি বেগমের সঙ্গে রাজুর বিয়েও দেন আমিনুর রহমান। দত্তকপুত্রকে ঘিরে ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তা ও পারিবারিক বন্ধনের ওপর আস্থা রেখেই তিনি তাকে বড় করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
তবে আমিনুর রহমানের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁর সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর দত্তকপুত্র ও তাঁর স্ত্রীর নজর পড়ে এবং একপর্যায়ে তাঁকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার নানা কৌশল শুরু হয়।
অচেতন করে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে আমিনুর রহমান দাবি করেন, প্রায় ১২ বছর আগে তাঁকে অচেতন করার ওষুধ খাওয়ানো হয়। ওই অবস্থায় কৌশলে তাঁর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সব স্থাবর সম্পত্তি লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
বৃদ্ধের দাবি, জীবনের দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম ও অবসরকালীন সময়ে পাওয়া অর্থ দিয়ে যে সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদের ওপরও তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।
তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রকৃত প্রক্রিয়া, দলিলের ধরন এবং ওই সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা কী ছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ
সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগের পর এবার তাঁকে হত্যার চেষ্টারও অভিযোগ করেছেন আমিনুর রহমান।
লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, গত ৩ আগস্ট সকালে রাকিবুল ইসলাম রাজু তাঁর স্ত্রী শিউলি বেগমকে আমিনুর রহমানের খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। পরে বিষয়টি কোনোভাবে টের পেয়ে তিনি ওই খাবার না খেয়ে প্রাণে রক্ষা পান বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দেরও বিষয়টি জানান বলে দাবি করেছেন বৃদ্ধ।
তবে খাবারে বিষ মেশানোর অভিযোগের সত্যতা এবং এ ঘটনায় কোনো বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
চিকিৎসা ও খাবার না দেওয়ার অভিযোগ
আমিনুর রহমানের আরও অভিযোগ, অবসরকালীন জীবনের সঞ্চয় ও উপার্জনের অর্থ তিনি দীর্ঘদিন সংসারের পেছনে ব্যয় করেছেন। বর্তমানে বয়সের ভারে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তিনি।
বিশেষ করে স্ট্রোকের জটিলতা ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ায় নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। তাঁর দাবি, প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকার ওষুধের প্রয়োজন হলেও তাঁকে ঠিকমতো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না।
এ ছাড়া তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। ফলে নিজের বাড়িতে থেকেও নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে বলে জানান এই বৃদ্ধ।
শেষ বয়সে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমিনুর
জীবনের দীর্ঘ সময় যাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন, সেই দত্তকপুত্রের বিরুদ্ধেই সম্পত্তি আত্মসাৎ ও হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় চরম উদ্বেগে রয়েছেন আমিনুর রহমান।
তাঁর অভিযোগ, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দত্তকপুত্রকে মানুষ করেছেন, তাঁর বিয়ের ব্যবস্থাও করেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে এসে সেই সম্পর্কই তাঁর জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃদ্ধের দাবি, তিনি এখন সম্পত্তি ফিরে পাওয়া বা অন্য কোনো সুবিধার চেয়ে নিজের নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাই চান।
পুলিশের তদন্ত চলছে
এ বিষয়ে ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, বৃদ্ধ আমিনুর রহমানের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ সময় উভয় পক্ষের লোকজন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
ওসি বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আমিনুর রহমানের অভিযোগে অভিযুক্ত রাকিবুল ইসলাম রাজু ও তাঁর স্ত্রী শিউলি বেগমের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের বিষয়ে আরও স্পষ্টতা পাওয়া যাবে।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে
বৃদ্ধ আমিনুর রহমানের অভিযোগে সম্পত্তি লিখে নেওয়া, খাবারে বিষ মেশানো এবং চিকিৎসা ও খাবার থেকে বঞ্চিত করার মতো গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে পুলিশ জানায়নি।
অভিযোগের সত্যতা, সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা, কথিত বিষ প্রয়োগের ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা—সবকিছু তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। পুলিশও জানিয়েছে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শেষ বয়সে একজন অসহায় বৃদ্ধের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

